জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ বৃষ্টির দ্বিমুখী প্রভাবে নাগালের বাইরে সবজি মাছ মাংস
নিজস্ব প্রতিবেদক।। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টির দ্বিমুখী প্রভাবে রাজধানীর কাঁচাবাজারে সব ধরনের সবজি, মাছ ও মাংসের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে সবজি ও মাছ-মাংসের দাম কেজিতে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যার ফলে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুর, মালিবাগ, কারওয়ান বাজার ও রামপুরাইসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের এই চড়া চিত্র দেখা গেছে।
পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এই জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকে করে পণ্য ঢাকায় আনতে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এর ওপর গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফসলের খেত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দুই কারণে ঢাকার বাজারে সবজির সরবরাহ কমায় দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।
বাজারের সবজির দাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে বেশিরভাগ সবজিই আশি টাকা বা তার চেয়ে বেশি কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে শীতকালীন আগাম সবজি শিম, যার প্রতি কেজির দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। এর পরেই রয়েছে গোল বেগুন ও গাজর, যা খুচরা বাজারে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুন ও টমেটো বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে।
মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা রিয়াজুল ইসলাম বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে পরিবহন খরচ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে মাল আনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে সবজির দাম আমাদের বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে খুচরা বাজারেও আমাদের বাড়তি দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে, অন্যথায় লোকসান গুনতে হবে।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মিজান জানান, ঢাকার বাজারে বেগুনসহ বড় একটি অংশের সবজি আসে যশোর জেলা থেকে। আগে যশোর থেকে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকে করে সবজি ঢাকায় আনতে ভাড়া লাগত ১৮ হাজার টাকা। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার পর সেই একই ট্রাকের ভাড়া এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার টাকায়। পাইকাররা আগে যে বেগুন ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে কিনে আনতেন, এখন যাতায়াত খরচ বৃদ্ধির কারণে কারওয়ান বাজারেই সেই বেগুন ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সবজির এই চড়া মূল্যের বাজারে মাঝারি ও নিম্নআয়ের ক্রেতারা পড়েছেন চরম বিপাকে। মিরপুর-১১ নম্বর কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মিনহাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনে কিছুটা প্রভাব পড়ে ঠিকই। কিন্তু তার জন্য একটি পণ্যের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বাড়তে পারে। একবারেই যে একটি পণ্যের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে, এমনটা কোনোভাবেই হওয়ার কথা নয়। তিনি অভিযোগ করেন, বাজারে প্রশাসনের কোনো ধরনের নজরদারি নেই। এই সুযোগে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা যে যার মতো করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
অন্যান্য সবজির মধ্যে বাজারে প্রতি কেজি শসা, কচুর লতি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল ও ধুন্দল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। এ ছাড়া করলা প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পটোল ও ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোট আকারের ফুলকপি প্রতি পিস ৭০ টাকা এবং লাউ প্রতি পিস ৭০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। জালি কুমড়া প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। বাজারে সবচেয়ে কম দামি সবজি হিসেবে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা পেঁপে, যা প্রতি কেজি ৩০ টাকা। এ ছাড়া কাঁচা কলা ও লেবু প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রান্নার অন্যতম প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ কাঁচা মরিচের দামও নিয়ন্ত্রণে নেই, বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মালিবাগ বাজারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার করতে আসা আসাদুজ্জামান বলেন, আজ বাজারে সবজির দাম অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক বেশি বাড়তি মনে হচ্ছে। বিক্রেতারা বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কম এবং গাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাত দিচ্ছেন। বাজারে গিয়ে আশি টাকার নিচে কোনো সবজি হাত দেওয়া যাচ্ছে না। শিম ২০০ টাকা আর বেগুন ১৬০ টাকা কেজি হলে আমাদের মতো সাধারণ চাকরিজীবীদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রামপুরা বাজারের সবজি বিক্রেতা রহিদুল ইসলাম অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে ফসলের খেত নষ্ট হওয়ায় বাজারে মালের কিছুটা ঘাটতি আছে। তবে আর কিছুদিন পর যখন সবজির মূল মৌসুম পুরোপুরি শুরু হবে, তখন বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
এদিকে সবজির পাশাপাশি মাছ ও মাংসের বাজারেও আগুন লেগেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মাছের সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছেন কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা। বাজারে বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। আর দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের বড় ইলিশের কেজি ঠেকেছে ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত। দেশি নদীর মাছের মধ্যে রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতল মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং শিং মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের পাঙাশ ও তেলাপিয়া মাছের দামও কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ব্রয়লার মুরগি বাজারভেদে ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজিতে। গরুর মাংসের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও খাসির মাংসের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি কেজি ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম গত সপ্তাহের মতোই প্রতি ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা দরে স্থিতিশীল রয়েছে। চালের দামেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
এছাড়া করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দুই সপ্তাহ আগে আটা ও ময়দার দাম বাড়ালেও তা বর্তমানে আগের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে বেসরকারি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সরকারি মিল্কভিটা পাস্তুরিত তরল দুধের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
সাধারণ ক্রেতারা মনে করছেন, নিত্যপণ্যের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির পেছনে শুধু পরিবহন খরচ দায়ী নয়, বরং এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটও এর জন্য কাজ করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিয়মিত তদারকি ও কঠোর অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।











