যন্ত্রের চোখে দেখা পথ, মানুষের চোখে খোঁজা গন্তব্য
মো. মামুন হাসান।। ক্লাসরুমে ঢোকার আগে প্রতিদিন একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়। আমি যাদের শেখাচ্ছি, তারা যখন কর্মক্ষেত্রে যাবে, তখন পর্যটন শিল্পটা আজকের চেহারায় থাকবে তো? উত্তরটা প্রতিবারই এক, না, থাকবে না। এই না থাকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের সবচেয়ে জরুরি বার্তা। জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা এবার যে প্রতিপাদ্য বেছে নিয়েছে, ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন, তা কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা নয়। এটা এমন একটা বাস্তবতা, যা এই মুহূর্তে আমাদের শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে।
সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে বসে আমি দেখি, আমার শিক্ষার্থীরা একটা হোটেলের বুকিং সিস্টেম শেখার আগেই মোবাইল ফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অ্যাপ দিয়ে ভ্রমণসূচি বানিয়ে ফেলছে। তারা প্রশ্ন করছে না গাইডবুক থেকে, তারা কথা বলছে একটা চ্যাটবটের সঙ্গে, যে মুহূর্তেই বলে দিচ্ছে কোন হোটেলে থাকা ভালো, কোন রেস্তোরাঁয় খাবার সস্তা আর ভালো, কোন রাস্তায় ভিড় কম। এই পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে পাঠ্যক্রম লেখার কালি শুকানোর আগেই সেই পাঠ পুরোনো হয়ে যায়। একজন শিক্ষক হিসেবে এটা আমার কাছে শঙ্কার বিষয় যতটা, তার চেয়ে বেশি সুযোগের বিষয়।
সুযোগ বলছি এই কারণে যে, আমাদের সাতক্ষীরার মতো জেলা শহরে বসেও একটা শিক্ষার্থী এখন বিশ্বমানের তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করতে পারে বিনা খরচে, বিনা ভ্রমণে। সুন্দরবনের কোলে বেড়ে ওঠা একটা ছেলে বা মেয়ে তার নিজের এলাকার পর্যটন সম্ভাবনাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারে, যেখানে আগে এই কাজের জন্য দরকার হতো বহুজাতিক প্রচার সংস্থার পুঁজি। প্রযুক্তি এখানে সমতার হাতিয়ার হতে পারে, যদি আমরা তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখাই।
কিন্তু এই সমতার প্রতিশ্রুতির পাশেই একটা কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়ে থাকে। যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিদিন লাখো মানুষকে বলে দিচ্ছে কোথায় যেতে হবে, তার সিদ্ধান্তের পেছনে কার স্বার্থ কাজ করছে? বড় বড় ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম যদি তাদের নিজের পছন্দের গন্তব্যকে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে, আর ছোট, কম পরিচিত অথচ সমান সুন্দর জায়গাগুলো যন্ত্রের চোখের আড়ালে থেকে যায়, তাহলে প্রযুক্তি সমতা আনার বদলে বৈষম্য আরও গভীর করবে। শ্যামনগরের কোনো ইকো ট্যুরিজম উদ্যোগ, কিংবা মুন্সিগঞ্জের কোনো নদীপাড়ের হোমস্টে, এসব যদি অ্যালগরিদমের র্যাংকিংয়ে জায়গা না পায়, তাহলে সেই জায়গাগুলোর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে থেকে যাবে। এই জায়গাটাতেই শিক্ষকের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। প্রযুক্তিকে কেবল ব্যবহার করা শেখানো যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তির পেছনের যুক্তি বোঝানোও দরকার।
আমি প্রায়ই আমার শিক্ষার্থীদের একটা কথা বলি, যন্ত্র পথ দেখাতে পারে, কিন্তু আতিথেয়তা শেখাতে পারে না। একটা চ্যাটবট বলে দিতে পারবে কোন হোটেলে রুম খালি আছে, কিন্তু সেই হোটেলের রিসেপশনে দাঁড়িয়ে একজন ক্লান্ত পর্যটককে যে হাসিমুখে স্বাগত জানাবে, সেই মানবিক স্পর্শটা তৈরি করা সম্ভব নয় কোনো কোডে। আমাদের বিভাগে আমরা তাই একটা ভারসাম্যের পাঠ দিতে চাই। একদিকে ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন রিজার্ভেশন সিস্টেম শেখানো হচ্ছে, অন্যদিকে অতিথি সেবার সেই পুরোনো শিল্পটাও যেন হারিয়ে না যায়, তার চর্চা চলছে সমান গুরুত্বে।
এবারের প্রতিপাদ্যের একটা গভীর দিক আছে, যা অনেকেই খেয়াল করছেন না। এই বছরই প্রথমবার এমন এক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে দিবস উদযাপিত হচ্ছে, যে প্রযুক্তি ইতিমধ্যে নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মানুষ কোথায় যাবে। এর আগে প্রতিটা প্রতিপাদ্যে বলা হয়েছিল একটা শক্তিকে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে। এবার সেই শক্তি নিজেই চালকের আসনে বসে গেছে। এই বাস্তবতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটা সতর্কবার্তা। আমরা যদি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী তৈরি করি, নির্মাতা নয়, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের পর্যটন অর্থনীতিতে কেবল উপভোক্তা থেকে যাবে, নির্ধারক হবে না।
সাতক্ষীরার মতো এলাকায় সুন্দরবন ঘিরে যে বিপুল সম্ভাবনা আছে, তা এখনো অনেকটাই অব্যবহৃত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার স্বপ্ন, আমার শিক্ষার্থীরা একদিন এমন একটা স্থানীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যেখানে সুন্দরবনের প্রতিটা ছোট গ্রাম, প্রতিটা মধু সংগ্রাহকের গল্প, প্রতিটা নদীর বাঁক নিজের ভাষায়, নিজের সত্যতায় বিশ্বের সামনে হাজির হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তখন হবে আমাদের গল্প বলার হাতিয়ার, কারও গল্প চাপা দেওয়ার যন্ত্র নয়।
বিশ্ব পর্যটন দিবস তাই এই বছর আমার কাছে একটা আয়নার মতো। এই আয়নায় দেখা যায়, প্রযুক্তি যত এগিয়ে যাক, মানুষ কোথায় যেতে চায় তার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকা উচিত। যন্ত্র সাহায্য করবে, পথ দেখাবে, তথ্য দেবে, কিন্তু গন্তব্যের গল্প লিখবে মানুষই। শিক্ষক হিসেবে আমার কাজ তাই কেবল কোড শেখানো নয়, বরং এই বোধটা তৈরি করা, যাতে আমার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের পর্যটন গড়ার সময় প্রযুক্তির কাছে নিজেদের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে না ফেলে।
আগামীর পর্যটন যেমন ডিজিটাল হবে, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সমৃদ্ধ হবে, তেমনই তা যেন থেকে যায় মানবিক, স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি সৎ, আর সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই তিনটে শর্ত পূরণ হলেই এই দিনটার উদযাপন সত্যিকারের অর্থবহ হবে। নইলে এটা কেবল আরেকটা প্রযুক্তি বিষয়ক সম্মেলনের নামান্তর হয়ে থাকবে।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।











