ঢাকা | অক্টোবর ২, ২০২৬ - ১১:২২ অপরাহ্ন

শিরোনাম

সম্পাদকীয়

শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর ষাট বছর

মো. মামুন হাসান।। প্রতিবছর ৫ অক্টোবর এলে আমরা শিক্ষকদের স্মরণ করি।এবারের দিনটি বিশেষ, কারণ ১৯৬৬ সালে গৃহীত আইএলও ও ইউনেস্কোর শিক্ষকের মর্যাদা বিষয়ক সুপারিশের ষাট বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ উপলক্ষে ইউনেস্কোর ঘোষিত প্রতিপাদ্য, “শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি ও আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ষাট বছর”। একজন শিক্ষক হিসেবে কথাটি আমার কাছে কেবল একটি স্লোগান নয়, প্রতিদিনের শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব আর কর্মশালার বাস্তবতার প্রতিধ্বনি।

ষাট বছর আগে বিশ্ব একটি সহজ সত্য মেনে নিয়েছিল। শিক্ষক যদি সম্মান, নিরাপত্তা আর পেশাগত স্বাধীনতা না পান, তাহলে কোনো জাতিই মানসম্মত শিক্ষা পাবে না। কাগজে সেই স্বীকৃতি আজও আছে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে আমরা সেই প্রতিশ্রুতির কতটা কাছে পৌঁছেছি।

আমি টেকনিক্যাল শিক্ষার শিক্ষক। পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থীদের আমি শেখাই কীভাবে একজন অতিথিকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে সেবার মধ্য দিয়ে একটি দেশের মুখ উজ্জ্বল করা যায়। কিন্তু প্রতিদিন নিজেকেই প্রশ্ন করি, যে সমাজ শিক্ষককে যথাযথ সম্মান দিতে শেখেনি, সে সমাজ কি তার তরুণদের সেবা আর সম্মানের সংস্কৃতি শেখাতে পারবে। শিক্ষকের প্রতি আচরণই আসলে একটি জাতির সভ্যতার মাপকাঠি।

আজকের শিক্ষক আর কেবল পাঠ্যবইয়ের বাহক নন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শিক্ষার্থীর হাতের মুঠোয়। যে তথ্য আগে শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া যেত, তা এখন এক মুহূর্তে মোবাইলের পর্দায় হাজির। তাই অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, শিক্ষকের প্রয়োজন কি ফুরিয়ে এল। আমার অভিজ্ঞতা বলে, ঠিক উল্টোটাই সত্য। তথ্য যত সহজলভ্য হচ্ছে, সেই তথ্য যাচাই করার বিবেচনা, তা প্রয়োগ করার দক্ষতা আর তার পেছনের নৈতিকতা শেখানোর মানুষটির গুরুত্ব তত বাড়ছে। যন্ত্র উত্তর দিতে পারে, কিন্তু কোন প্রশ্নটি করা উচিত সেটি একজন শিক্ষকই শেখান। যন্ত্র তথ্য দেয়, শিক্ষক দেন দৃষ্টিভঙ্গি।

কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বড়। আমাদের শিক্ষার্থীরা পাঠ শেষ করে সরাসরি শিল্পকারখানা, হোটেল, রিসোর্ট আর সেবা খাতে যোগ দেয়। শিল্পের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, অতিথির প্রত্যাশাও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে শিক্ষককে নিজেও নিয়মিত শিখতে হয়। কিন্তু হালনাগাদ প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ আর গবেষণার সুযোগ ছাড়া সেই শেখা টেকসই হয় না। শিক্ষককে নতুন দক্ষতায় সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ দেওয়াটা তাই কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি জাতীয় বিনিয়োগ।

শিক্ষকের মর্যাদা বলতে আমি কেবল বেতন বা পদোন্নতির কথা বলছি না, যদিও ন্যায্য পারিশ্রমিক ও স্বচ্ছ কর্মজীবন কাঠামো এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি বলছি বিশ্বাসের কথা। শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজ, অসংখ্য প্রতিবেদন আর তথ্যের চাপে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা হয় যে শেখানোর মূল কাজটির জন্য সময় কমে আসে। একজন শিক্ষককে যখন পেশাদার হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তাঁর সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা থাকে, তাঁর কথা নীতিনির্ধারকের টেবিলে পৌঁছায়, তখনই তিনি সবচেয়ে ভালো ফল দিতে পারেন। শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় শ্রেণিকক্ষের মানুষটির কণ্ঠ শোনা হোক, এটুকুই আমাদের চাওয়া।

আরেকটি কথা না বললেই নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে শিক্ষকের সম্মান কখনো কখনো এক মুহূর্তের ভিডিও আর অর্ধসত্য মন্তব্যে ক্ষুণ্ণ হয়। শিক্ষকের ভুল হতে পারে, তিনিও মানুষ। কিন্তু একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে হেয় করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থীর আস্থাকে দুর্বল করা। সমালোচনা হোক, জবাবদিহি হোক, তবে সেটি হোক মর্যাদার সঙ্গে।

শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব সবার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নীতি ও বাজেটে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সহযোগিতামূলক ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ গড়া। অভিভাবকের দায়িত্ব শিক্ষকের সঙ্গে অংশীদার হয়ে সন্তানের পাশে থাকা। আর শিক্ষার্থীর দায়িত্ব জ্ঞানের প্রতি বিনয়ী থাকা। আমরা শিক্ষকরাও আত্মসমালোচনার বাইরে নই। নিজেদের পেশাগত মান, সততা আর শেখানোর আগ্রহ ধরে রাখাই সম্মান অর্জনের প্রথম শর্ত।

ফুল, উপহার আর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এক দিনের শ্রদ্ধা জানানো সুন্দর। কিন্তু ষাট বছর পূর্তির এই দিনে আমাদের চাওয়া আরও গভীর। আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মেধাবী তরুণেরা গর্বের সঙ্গে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে, কারণ তারা জানে এখানে সম্মান আছে, সুযোগ আছে, ভবিষ্যৎ আছে। একটি দেশের উন্নয়নের গল্প শুরু হয় একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে, আর সেই শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন একজন শিক্ষক।এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই একটিই অঙ্গীকার হোক। শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো মানে আগামী প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানো।

মো. মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।

সম্পর্কিত