ঢাকা | অক্টোবর ১১, ২০২৬ - ২:০১ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

সারাদেশ

ফেসবুক বন্ধু রাজুর ডাকে কক্সবাজার যাত্রা: ফেরার পথে স্কুলছাত্রী তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যা

কুমিল্লা প্রতিনিধি।। ফেসবুকে পরিচয়ের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় বন্ধু রাজু চৌধুরীর (২০) ডাকে সাড়া দিয়ে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার গিয়েছিল সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। কিন্তু সেই যাত্রাটিই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াল। কক্সবাজার থেকে একাকী কুমিল্লায় ফেরার পথে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করার পর নির্মম ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে সে।

এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে জেলা পুলিশ ও ডিবি যৌথ অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঘাতক সিএনজিচালক মো. সুমন মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশ নিশ্চিত করেছে, তাজমিনের ফেসবুক বন্ধু রাজু এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়; সিএনজিচালক সুমন একাই তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে তার আইফোনটি নিয়ে পালিয়েছিল।

নিহত জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অন্যদিকে রাজু চৌধুরী কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রাজু চৌধুরীর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় হয়। পরিচয়ের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় রাজুর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। প্রথমে পাশের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া গেলেও পরে সেখান থেকে কুমিল্লা হয়ে সরাসরি কক্সবাজার চলে যায় সে। চারদিন নিখোঁজ থাকার পর গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে তাজমিন ও রাজু কক্সবাজারের ‘কক্সেস প্যানারোমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সি’র কাউন্টারে গিয়ে কুমিল্লার টিকিট কাটে।

কাউন্টার ম্যানেজার আবদুল্লাহ জানান, ছেলেটি (রাজু) পরদিন বুধবারের জন্য তাজমিনের নামে একটি একক টিকিট কেটে দেয়। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’র বাসে করে তাজমিন একাই কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় এবং রাজু কক্সবাজারেই থেকে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে রাজু বা তাজমিনের কোনো বান্ধবীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে সচেতন মহলের মতে, রাজুর ডাকে সাড়া দিয়ে কক্সবাজার না গেলে হয়তো মেয়েটিকে এই নির্মম পরিণতির শিকার হতে হতো না।

বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে নামে তাজমিন। রাত ১২টা ১৯ মিনিটে সে বাসায় ফেরার জন্য সুমন মিয়ার সিএনজি অটোরিকশাটি ভাড়া করে। কিন্তু চালক সুমন তাকে রেসকোর্সের বাসায় না নিয়ে লালমাই উপজেলার জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার নির্জন সড়কের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সুমন তাকে ধর্ষণ করে এবং নিজের সিএনজিতে থাকা গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

হত্যাকাণ্ডের ঠিক কিছুক্ষণ আগে, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমিন তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে বার্তা দিয়েছিল—”বাবা আমাকে নিয়ে যাও, আমি ভয় পাচ্ছি”। কিন্তু গভীর রাতে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পাননি। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে লোকেশন ট্র্যাক করে জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন বাবা আব্দুল আলিম।

হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের আইফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে নিজের অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলেই ফেলে পালিয়ে যায় সুমন। শনিবার (১০ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, ফেলে যাওয়া অটোরিকশার সূত্র ধরে শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর অলংকার মোড় এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদ এলাকার জঙ্গল থেকে তাজমিনের লুণ্ঠিত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। সুমন আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।

সম্পর্কিত