ঢাকা | নভেম্বর ৬, ২০২৬ - ৮:৫২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

অবৈধ স্মার্টফোন ঠেকাতে আবার অভিযানে যাচ্ছে বিটিআরসি

নিজস্ব প্রতিবেদক।। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আবারও সারা দেশে অবৈধ মোবাইল ফোনের বিপণন, বিক্রি ও বিতরণের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশে গ্রে-মার্কেট স্মার্টফোনের বাজার দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি কমিশনের এক বৈঠকে বিটিআরসির এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন (ইঅ্যান্ডআই) অধিদপ্তরের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শুধু মোবাইল ফোন নয়, অবৈধ রেডিও, ওয়্যারলেস ও টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করা হবে।

তিন বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর আবার এই অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে।

বিটিআরসির কর্মকর্তাদের মতে, বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন এলাকা ও জেলা শহরগুলোতে অবৈধভাবে মোবাইল ফোন আমদানি, সংযোজন, বিতরণ ও বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এসব কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, অবৈধ হ্যান্ডসেটের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, বৈধ উৎপাদকরা অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং নিম্নমানের ডিভাইস বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।

এর আগে বিটিআরসি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ হ্যান্ডসেট ও অননুমোদিত টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি জব্দ করত। তবে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। যদিও সিগন্যাল জ্যামার, রিপিটার, বুস্টার ও অবৈধ ভিওআইপি যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধে অভিযান চলমান ছিল।

বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, এই স্থগিতের পেছনে ছিল ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) সিস্টেম চালুর প্রস্তুতি এবং ২০২৬ সালের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক কার্যক্রম।

২০২১ সালে চালু হওয়া NEIR সিস্টেমের লক্ষ্য ছিল মোবাইল ফোনের IMEI নম্বরকে সিম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করে বৈধ মোবাইল ডিভাইসের একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা। এর মাধ্যমে অবৈধ ফোন শনাক্ত করে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু শুরু থেকেই এই সিস্টেম নানা বিতর্ক ও অনিশ্চয়তায় পড়ে। মোবাইল অপারেটর, আমদানিকারক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, ভোক্তা ভোগান্তি এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এছাড়া দেশে ইতোমধ্যে ব্যবহৃত কোটি কোটি অনানুষ্ঠানিক ফোনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

যদিও বিটিআরসি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়েছিল এবং অবৈধ ডিভাইস ব্লক করার সময়সীমাও ঘোষণা করেছিল, বাস্তবে স্বয়ংক্রিয় ব্লকিং ব্যবস্থা কখনও চালু করা হয়নি। ফলে NEIR কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের নীতিগত অনিশ্চয়তা অবৈধ মোবাইল ব্যবসাকে আরও উৎসাহিত করেছে।

সম্প্রতি বিটিআরসি NEIR-এর কিছু কার্যক্রম আবার চালু করেছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মোবাইল ফোন ব্লকিং ব্যবস্থা চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের নীতিগত অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

এদিকে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল নজরদারি, মোবাইল ফোনে বাড়তি শুল্ক ও ভ্যাট, আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে গ্রে-মার্কেট আরও দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।

বৈধভাবে আমদানি করা স্মার্টফোনের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা বিশেষ করে প্রিমিয়াম ও মধ্যম মানের ডিভাইসের জন্য অনানুষ্ঠানিক বাজারের দিকে ঝুঁকেছেন।

শিল্পখাতের তথ্য ও বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মোবাইল ফোন বাজারের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশই গ্রে-মার্কেটের দখলে। বছরে প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বাজারে ২০২৫ সালে অবৈধ বাজারের পরিমাণ ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ হ্যান্ডসেট শুধু সরকারের শুল্ক রাজস্ব কমায় না, টেলিযোগাযোগ নিরাপত্তা ও আইনগত নজরদারি ব্যবস্থাকেও জটিল করে তোলে। কারণ এসব ডিভাইস অনেক সময় নিবন্ধন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিটিআরসির ইঅ্যান্ডআই অধিদপ্তর পুলিশ, র‍্যাব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে। কমিশন নীতিগতভাবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়ার পর সারা দেশে অভিযান শুরু হবে বলে জানিয়েছে।

সম্পর্কিত