ঢাকা | মে ১৭, ২০২৬ - ১২:০১ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান: সংকট নিরসন ও কৌশলগত উত্তরণ

  • আপডেট: Saturday, May 16, 2026 - 11:21 pm

ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম।। জাপান বর্তমানে ইতিহাসের এক ভয়াবহ জনতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি। দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস এবং ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর আধিক্য দেশটিতে এক নজিরবিহীন শ্রমিক শূন্যতা তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে জাপান সরকার বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য তাদের শ্রমবাজার বড় পরিসরে উন্মুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি স্বর্ণালি সুযোগ হতে পারে।

জাপানের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে ‘নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী’ বা Specified Skilled Worker (SSW) ক্যাটাগরিতে ১৬টি সুনির্দিষ্ট খাতে প্রায় ৮.২ লক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস বলছে, ২০৪০ সাল নাগাদ এই চাহিদার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১.১ কোটি।

বর্তমানে জাপান কেয়ারগিভার, নির্মাণ, কৃষি, আইটিসহ ১৬টি খাতে কর্মী নিচ্ছে। এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশ যদি সঠিক কৌশল ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই বাজারের অন্তত ৪০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ দখল করা সম্ভব। জাপানের এই আকাশচুম্বী চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার রেমিটেন্স প্রবাহে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

জাপানের এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান এবং প্রতিযোগীদের সাথে তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাপানি শ্রমবাজারের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ বর্তমানে নেপাল, ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। ভিয়েতনাম বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ কর্মী পাঠিয়ে এই বাজারের শীর্ষস্থানে রয়েছে। নেপাল প্রায় ২ লক্ষ কর্মী পাঠিয়ে আছে দ্বিতীয় অবস্থানে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ তার বিশাল জনসংখ্যা সত্ত্বেও জাপানের মোট চাহিদার মাত্র ১-২ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জাপানে বাংলাদেশের কর্মী মাত্র ৩৩ হাজার থেকে ৪০ হাজার।

জাপানে জনশক্তি রপ্তানির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার এই সংকটের মূলে যে কাঠামোগত অন্তরায়গুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো দক্ষতা ও ভাষাগত সীমাবদ্ধতা। জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো বাংলাদেশের কর্মীদের গুণগত মান ও প্রস্তুতির ঘাটতি। জাপানি নিয়োগকর্তারা শুধু শারীরিক শ্রম প্রত্যাশা করেন না; তারা নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং জাপানি কর্মসংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল কর্মী খোঁজেন। বাংলাদেশের কর্মীদের ক্ষেত্রে এই তিনটি ক্ষেত্রেই বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে।

জাপানে কাজ করতে অন্তত N4 বা N5 লেভেলের ভাষা দক্ষতা অপরিহার্য। N5 হলো জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার (Japanese Language Proficiency Test) সবচেয়ে প্রাথমিক বা প্রথম স্তর, যা নতুনদের মৌলিক জাপানি বোঝার ক্ষমতা যাচাই করে। এটি মূলত হিরাগানা, কাতাকানা, প্রায় ১০০টি কাঞ্জি এবং ৮০০টি মৌলিক শব্দভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কথাবার্তা বুঝতে ও পড়তে সাহায্য করে। N5 ৫টি স্তরের (N1-N5) মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর।

মানসম্মত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভাবে কর্মীরা শুধু N5 পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে হিমশিম খাচ্ছে। এছাড়া ১৬টি নির্দিষ্ট খাতের (যেমন: নার্সিং কেয়ার, কৃষি, নির্মাণ) জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সাথে বাংলাদেশি কর্মীদের পরিচয় খুবই সীমিত। জাপানি কর্মসংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো সময়ানুবর্তিতা, শিষ্টাচার এবং কাজের নির্ভুলতা। এই বিষয়গুলোতেও পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় দক্ষ কর্মীরাও জাপানে গিয়ে টেকসই হতে পারছে না।

জাপানের জন্য ন্যূনতম ৬-৯ মাস নিবিড় প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, কিন্তু বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে দ্রুত এবং স্বল্প প্রশিক্ষণে বিদেশ যাওয়ার মানসিকতা খুব কম। জাপানে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো ‘দালাল-নির্ভর’ নয়, বরং ‘যোগ্যতা-নির্ভর’ —এই বার্তাটি এখনো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কর্মীদের এই অদক্ষতার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দক্ষ প্রশিক্ষকের সংকট। দক্ষ কর্মী তৈরির প্রধান কারিগর হলেন প্রশিক্ষক। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। মানসম্মত প্রশিক্ষকের অভাবে প্রশিক্ষণার্থীরাও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অনেক প্রশিক্ষক জাপান থেকে ফিরে এসে ভাষা শেখাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের পেশাদার শিক্ষকতা বা শিক্ষাদান পদ্ধতির (Pedagogy) কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ফলে তারা ব্যাকরণগত বা পদ্ধতিগতভাবে সঠিক শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে এখনো পুরনো ও তাত্ত্বিক পাঠ্যক্রম ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জাপানের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল সিমুলেশন, অনলাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব এবং বাস্তব কর্মপরিবেশভিত্তিক (Hands-on) প্রশিক্ষণের অভাব প্রশিক্ষকদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রশিক্ষকদের এই মানহীনতা সরাসরি প্রশিক্ষণার্থী বাছাই এবং তাদের চূড়ান্ত কর্মদক্ষতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। যদি প্রশিক্ষকরাই জাপানের পরিবর্তিত আইন ও প্রযুক্তির সাথে ওয়াকিবহাল না থাকেন, তবে তাদের দ্বারা তৈরি জনবল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এই সংকট নিরসনে সরকার যে সকল সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা পর্যালোচনা করা জরুরি।

বর্তমান সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের শ্রমবাজারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনিক ও নীতিগত পর্যায়ে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসমূহের মধ্যে রয়েছে- উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ, দূতাবাসের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো তৈরি, আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা ও জাপানি স্কিল ট্রেনিংয়ের জন্য দেশে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলা।
এসব সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে এবং ২০২৬ ও ২০৪০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানি কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ৫ দফা সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
মাস্টার ট্রেইনিং ও জাপানি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ: জাপানি বিশেষজ্ঞদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশি প্রশিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ‘মাস্টার ট্রেইনিং’ বা প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে প্রশিক্ষকদের জাপানে ইন্টার্নশিপের জন্য পাঠানো।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ): জাপানি মানসম্পন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেখানে জাপানি কোম্পানিগুলো সরাসরি তাদের চাহিদামতো কর্মী তৈরি করতে পারবে।
ডিজিটাল লার্নিং ও তৃণমূল সচেতনতা: গ্রাম পর্যায়ে ভাষা শিক্ষা পৌঁছে দিতে বিশেষায়িত মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা। এছাড়া জাপানের কর্মসংস্কৃতি ও শিষ্টাচার সম্পর্কে প্রান্তিক পর্যায়ে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।
সরাসরি G2G ও MoU শক্তিশালীকরণ: জাপানি কোম্পানি এবং রিজিওনাল কাউন্সিলগুলোর সাথে সরাসরি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
কারিকুলামের আধুনিকায়ন: টিটিসি-র সিলেবাসকে জাপানের ১৬টি খাতের আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দ্রুত পরিমার্জন করা এবং এসএসডব্লিউ (SSW) পরীক্ষার জন্য নিবিড় প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা। এই সুপারিশগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন সোপান। যদিও বর্তমানে আমরা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছি, প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত উদ্যোগসমূহ— যেমন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়িত হলে এই চিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হবে।
দক্ষ জনশক্তি এবং প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক তৈরির মাধ্যমে ২০৪০ সালের মধ্যে জাপান থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উঠে আসা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। সঠিক কৌশলগত বিনিয়োগ এবং গুণগত মান বজায় রাখলে জাপান বাংলাদেশের জন্য সত্যিই একটি ‘গোল্ডেন মার্কেট’ হিসেবে প্রমাণিত হবে।

 

লেখক:
অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, চেয়ারম্যান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়. E-mail: [email protected]