কিছুটা কমেছে সবজির দাম, চড়া আদা ও ডিম
নিজস্ব প্রতিবেদক।। সরবরাহ বাড়ায় রাজধানীর বাজারগুলোতে সপ্তাহের ব্যবধানে কিছুটা কমেছে সবজির দাম। তবে অপরিবর্তিত রয়েছে মুরগি ও ফার্মের ডিমের বাজার।
শুক্রবার (২২ মে) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। যা গত সপ্তাহে ছিলো ১০০ টাকা।
করলা কেজিতে ২০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। ঢেঁড়স ৪০ থেকে ৫০ টাকা, পটল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা ও বরবটি কেজিতে ৩০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
এ ছাড়া বেগুন কেজিতে ৪০ টাকা কমে প্রকারভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা কেজিতে ৩০ টাকা কমে ৫০ টাকা, সাজনা কেজিতে ৪০ টাকা কমে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা ও ধুন্দল হাইব্রিড বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজিতে। কাঁচা আমের দাম প্রকারভেদে ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি।
কাঁচামরিচ কেজিতে ২০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। পেঁপে ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, দেশি শসা কেজিতে ৫০ টাকা কমে ৪০ থেকে ৬০ টাকা ও হাইব্রিড শসা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজিতে। টমেটো প্রকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা, দেশি গাজর ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মুলা ৭০ টাকা, ফুলকপি প্রতিপিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ টাকা ও লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকা পিস দরে বিক্রি হচ্ছে।
শাকের বাজারে লাল শাক আঁটি ১৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ টাকা, কলমি শাক দুই আঁটি ২০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ টাকা, ডাটা শাক দুই আঁটি ২০ টাকা ও পালং শাক দুই আঁটি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজি এবং দেশি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে।
বাজারগুলোতে এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ৩০ টাকায়। দেশি ধনেপাতা ২০০ টাকা, হাইব্রিড ধনেপাতা ১৫০ টাকা, কাঁচা কলা হালি ৪০ টাকা, চাল কুমড়া প্রতিপিস ৫০ টাকা ও ক্যাপসিকাম ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জুলহাস তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত সপ্তাহের চেয়ে দাম সামান্য কমলেও এক কেজি সবজি কিনতেই যদি ৮০-৯০ টাকা শেষ হয়ে যায়, তবে স্বল্প আয়ের মানুষের সংসার চলবে কীভাবে?”
টাউন হল বাজারে বাদল আক্ষেপ করে বলেন, “আগে ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে এলে ব্যাগ ভর্তি করে সওদা করা যেত। এখন শুধু সবজি কিনতেই টাকা ফুরিয়ে যায়। মাছ-মাংস কেনা তো এখন বিলাসিতা।” ক্রেতা রেহানা বেগমের মতে, বাজারে এসে এখন হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয়—কোনটা কিনবেন আর কোনটা বাদ দেবেন, সেই দ্বিধায় পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা আনিস জানান “গত সপ্তাহে বৈরি আবহাওয়া ও বৃষ্টির কারণে সবজির সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। চলতি সপ্তাহে সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমতির দিকে। তবে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ অনেক বেশি হওয়ায় আমরা ক্রেতাদের কাঙ্ক্ষিত কম দামে পণ্য দিতে পারছি না।”
এদিকে গত সপ্তাহের দামেই বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মুরগি। সোনালি কক মুরগি কেজি ৩২০ টাকা, সোনালি হাইব্রিড ২৯০ টাকা, লাল লেয়ার ৩০০ টাকা, সাদা লেয়ার ২৯০ টাকা, ব্রয়লার ১৭০ টাকা ও দেশি মুরগি ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজিতে। গরুর কলিজা ৮০০ টাকা, মাথার মাংস ৪৫০ টাকা, গরুর বট ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা ও খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে।
সবজি ও মাংসের বাজারে যখন টানাপোড়েন চলছে, ঠিক তখনই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে মাছের বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের মাছের দামই ঊর্ধ্বমুখী।
মাছের বাজারে ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
এ ছাড়া চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, দেশি শিং ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, রুই মাছ ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, দেশি মাগুর ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মৃগেল ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা চাষের পাঙ্গাস ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, বোয়াল ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা,
বড় কাতল ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, পোয়া ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ টাকা, কই ২০০ থেকে ২২০ টাকা, মলা ৫০০ টাকা, বাতাসি টেংরা ১ হাজার ৪০০ টাকা, টেংরা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, কাচকি ৪০০ টাকা ও পাঁচ মিশালি মাছ ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারগুলোতে এক ডজন মুরগির লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা, হাঁসের ডিম ২০০ টাকা, দেশি মুরগির ডিমের হালি ১০০ টাকা ও সোনালি কক মুরগির ডিমের হালি ৭০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে মাংসের বাজারে মূল্যের তেমন কোনো বড় রদবদল লক্ষ্য করা যায়নি। বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে পূর্বের মতোই ৮০০ টাকায়। এছাড়া দেশি মুরগির কেজি ঠেকেছে ৭৫০ টাকায়।
মাংস কিনতে আসা হায়দার নামের এক ক্রেতা জানান, সবজি ও মাংসের দামের কারণে তারা এখন কেনাকাটার পরিমাণ অর্ধেক করে দিয়েছেন। আগে যেখানে দুই কেজি মাংস কিনতেন, এখন বাধ্য হয়ে এক কেজিতেই সীমাবদ্ধ থাকছেন।
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র পাঁচদিন বাকি। কোরবানির এই ঈদে মাংসের নানা পদের রান্নার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তেলের পাশাপাশি মসলার চাহিদাও থাকে সবচেয়ে বেশি। তবে বরাবরের মতো প্রায় প্রতি বছর ঈদের ঠিক আগে মসলার বাজারে যে অস্থিরতা দেখা যায়, এবার চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন।
খুচরা বাজারে আদার দাম চড়া থাকলেও এলাচ, দারচিনি, জিরা বা রসুনের মতো অন্যান্য প্রয়োজনীয় মসলার দাম খুব একটা বাড়েনি। বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি আদা জাতভেদে ২০০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। আদার বাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও স্বস্তি দিচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং মানভেদে আমদানি করা রসুন ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে বাজারে দেশি রসুনের দাম আরও কমে ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
মালিবাগ বাজারের বিক্রেতা জিল্লুর রহমান জানান, এক সপ্তাহ আগে আদার দাম কেজিতে আরও ২০ টাকা বেশি ছিল, সেটা এখন কমেছে। আদা ছাড়া পেঁয়াজ, রসুন, শুকনো মরিচ বা অন্য কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি।
বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে পাইকারি বাজারে মসলার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। বন্দরে আমদানি ও খালাস প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকায় এবার আদা ছাড়া অন্য কোনো মসলার দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে যায়নি।
চাহিদার শীর্ষে থাকা গরম মসলার বাজারও এবার বেশ স্থিতিশীল। খুচরা বাজারে প্রতি একশোগ্রাম জিরা ৬০-৭০ টাকা, এলাচ ৪৫০-৫০০ টাকা, কালো এলাচ ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, দারচিনি ৪৫-৫০ টাকা, লবঙ্গ ১৩০-১৫০ টাকা, গোল মরিচ ১৪০-১৫০ টাকা ও তেজপাতা ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
রামপুরায় মা মসলা ঘরের স্বত্বাধিকারী আবু হোসেন বলেন, মসলার দাম যা বাড়ার সেটা ডলার সংকটের সময় গত দুই বছর আগে বেড়েছিল। এবার ঈদের নতুন করে গরম মসলার দাম বাড়েনি।
তবে পাড়া-মহল্লার ভেতরে অনেক মসলার দোকানে ওইসব গরম মসলায় কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও সেটা প্রতি একশোগ্রামে ১০ থেকে ৫০ টাকা।
মহল্লার বাজারে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী শায়লা পারভীন বলেন, কারওয়ান বাজার বা বড় বাজারে দাম না বাড়লেও আমাদের এলাকার দোকানে এসে দেখি জিরার দাম কেজিতে ২০ টাকা বেশি চাচ্ছে। এলাচের দামও একশো গ্রাম ৫৫০ টাকার নিচে নামছেই না। ছোট দোকানদাররা ঈদের উসিলায় নিজেদের মতো দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তারা সেটা করছে।
পাড়া-মহল্লার খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা পাইকারি বাজার থেকে খুব বেশি পরিমাণে পণ্য কিনতে পারেন না। যাতায়াত খরচ, বিক্রয় ও মজুতে ঘাটতি হিসাব করলে বড় বাজারের সমান দামে বিক্রি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
কারওয়ান বাজারে মসলা কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিবার ঈদের আগে মসলার বাজারে আগুন লাগে। এবার আদার দামটা একটু বেশি মনে হচ্ছে, তবে জিরা, দারুচিনি বা পেঁয়াজের দাম আগের মতোই আছে। বিশেষ করে ঈদের আগে ৪০-৪৫ টাকা কেজি পেঁয়াজ আমি কখনো কিনিনি।
বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার মসলার আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক ভালো। পাইকারি বাজারে কোনো ঘাটতি নেই। বরং বড় বড় বাজারে বাড়তি সরবরাহ চাপে মসলার দাম কমে গেছে।











