ঢাকা | জুলাই ১১, ২০২৬ - ১১:১৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কাপ্তাই, ৩২ স্থানে পাহাড়ধস ১৮ আশ্রয়কেন্দ্রে ৩১৭ জন

  • আপডেট: Saturday, July 11, 2026 - 8:09 pm

কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি:

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন, কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো উপজেলাজুড়ে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনো কাটেনি বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩২টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে উপজেলার ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে ৩১৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে কাপ্তাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮৪ জন, কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৭৩ জন, কর্ণফুলী স্টেডিয়ামে ৩০ জন এবং মুরালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ জন অবস্থান করছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রিতদের জন্য তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট ও বোতলজাত পানিসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্যোগে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণও অব্যাহত রয়েছে।

টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার বাজারগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে। পরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কাজ না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। অন্যদিকে নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় সবজি ও আমন ধানের আবাদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা।

কৃষক মো. আবদুল মালেক বলেন, “অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সবজি ও আমনের জমিতে পানি জমে আছে। দ্রুত পানি না নামলে উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”

দিনমজুর শাহজাহান, শুক্কুর ও রব বলেন, “কয়েক দিন ধরে কোনো কাজ নেই। অসহায় হয়ে ঘরে বসে আছি। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।”

কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে গাছ উপড়ে বিদ্যুতের খুঁটি ও সঞ্চালন লাইনের ওপর পড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম বলেন, “মানুষের জীবন রক্ষা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মহীন পরিবারের জন্য চাল বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়। যারা এখনো পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন, তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে অথবা নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, “এই দুর্যোগ আবারও প্রমাণ করেছে, শুধু ত্রাণ বিতরণ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর পরিকল্পিত পুনর্বাসন, পাহাড়ি ছড়া ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, টেকসই সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন জরুরি। তা না হলে প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”