ঢাকা | এপ্রিল ২৯, ২০২৬ - ৪:২৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ভয়াল ২৯ এপ্রিল, দেখতে দেখতে পূর্ণ হলো ৩৫ বছর

  • আপডেট: Wednesday, April 29, 2026 - 2:46 pm

মিরসরাই প্রতিনিধি।।

সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, সূর্যের আলো উঠেনি। সবার মুখে মুখে একটি শব্দ, আজ ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। তবুও থেমে ছিল না মানুষের কর্মব্যস্ততা। এভাবে সকাল গড়িয়ে দুপুর আর দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা। ধীরে ধীরে ঘরমুখো মানুষগুলো ফিরতে লাগল এবং যে যার মতো করে ঘরে অবস্থান করতে লাগল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের প্রহরে রেডিও-টেলিভিশন বুলেটিন শুরু, যেখানে বলা হয়, আজ ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত, বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল দিয়ে ঝড় বয়ে যেতে পারে, সঙ্গে বাতাসের গতিবেগ ২০০/২৫০ কিমি বয়ে যেতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হলো। রাত ১০টায় বাংলাদেশের বুকে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় “ম্যারি এন”। তাণ্ডব চালায় গভীর রাত পর্যন্ত। লণ্ডভণ্ড করে দেয় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় সৃষ্টি হলো, যার নাম ভয়াল ২৯ এপ্রিল।

আজ সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত করেছিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। সে ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক ঘণ্টায় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল উপকূলীয় এলাকা। চট্টগ্রামসহ দেশের উপকূলীয় জেলা-উপজেলার অসংখ্য মানুষ সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারান। লাশের পর লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল সর্বত্র। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। বিশ্ববাসী বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির নিষ্ঠুর এই আঘাত। সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের তিন দশক পেরিয়ে গেলেও, সেই বিভীষিকার স্মৃতি আজও কাঁদায় চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের। সেই সময়ে স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল চারদিকের পরিবেশ। পরদিন সারা বিশ্বের মানুষ অবাক-বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন ধ্বংসলীলা। আর্তনাদে কেঁপে উঠেছিল বিশ্ব-বিবেক। সরকারিভাবে বলা হয়, এই দুর্যোগে ১ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তবে বেসরকারিভাবে প্রকৃতির এ ধ্বংসযজ্ঞে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা যায়।

এই ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার পুরো উপকূল। উপকূলবাসী আজও ভুলতে পারছে না সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি। এই ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পতেঙ্গা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও হাতিয়াসহ পুরো উপকূলজুড়েই মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে নিহতের সংখ্যা বিচারে পৃথিবীর ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা এ ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়টিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিমি (১৫৫ মাইল/ঘণ্টা)। ঘূর্ণিঝড় ও এর প্রভাবে সৃষ্ট ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরও বেশি। ঘূর্ণিঝড়ে মানুষ ছাড়াও মারা যায় প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু। গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার। আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদের। প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছিল।

প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের এই দিনে স্মরণকালের সেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকা তছনছ করে এক মহাধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল। রাতের অন্ধকারে কয়েক ঘণ্টায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল উপকূলীয় এলাকা। আজকের দিনে সেই দিনটি মনে করিয়ে দেয় স্বজন হারানো স্বজনদের আর্তনাদ।