ঢাকা | জুন ৮, ২০২৬ - ৭:৪৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

দৃষ্টিভঙ্গির দেউলিয়াত্বে আটকে থাকা একটি সম্ভাবনাময় শিল্প

  • আপডেট: Monday, June 8, 2026 - 5:24 pm

মো. মামুন হাসান।। বাংলাদেশে ক্যারিয়ার মানেই কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক স্বীকৃতির তালিকা। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিসিএস ক্যাডার। এই তিনটি শব্দের বাইরে গেলে যেন ক্যারিয়ারের সংজ্ঞাই অনেকের কাছে ঝাপসা হয়ে যায়। এই মানসিক মানচিত্রে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নামটি এখনো অনেকের কাছে এক ধরনের বিভ্রান্তি। তাই একজন শিক্ষার্থী যখন বলে সে এই বিষয়ে পড়তে চায়, তখন প্রশ্ন আসে না, আসে রায়। হোটেলে চাকরি করবে নাকি?

এই প্রশ্ন আসলে প্রশ্ন নয়, এটি একটি সামাজিক সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্ত বলে দেয় কোন পেশা সম্মান পাবে আর কোন পেশা করুণার চোখে দেখা হবে। অথচ যে সমাজ পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, সেই সমাজই সেই হোটেল চালানোর পেশাকে তুচ্ছ করে। যে সমাজ বিদেশে গিয়ে রিসোর্টের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়, সেই সমাজই দেশে সেই আতিথেয়তা শিল্পকে “ওয়েটারের চাকরি” বলে খাটো করে। এ এক অদ্ভুত সভ্যতা, যেখানে উপভোগের পেশা সম্মান পায়, কিন্তু উৎপাদনের পেশা অবজ্ঞা পায়।

হসপিটালিটি: যে শিল্পকে আমরা ছোট শব্দে মেরে ফেলেছি

বাংলাদেশে হসপিটালিটি মানে অনেকের কাছে এখনো শুধু ট্রে বহন, রুম সার্ভিস বা অতিথিকে সালাম দেওয়া। এই সীমিত ধারণাই একটি বিশাল শিল্পকে সামাজিকভাবে অদৃশ্য করে দিয়েছে। বাস্তবে হসপিটালিটি হলো একটি জটিল ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান। এখানে আছে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, বিপণন, মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মান, ব্র্যান্ড ইমেজ এবং অপারেশনাল কৌশল। একটি আন্তর্জাতিক হোটেল কোনো সাধারণ ভবন নয়। এটি একটি চলমান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রতিদিন শত শত কর্মী কাজ করে, হাজারো অতিথি সেবা পায় এবং কোটি টাকার লেনদেন হয়। কিন্তু আমরা এই পুরো ব্যবস্থাকে একটি শব্দে নামিয়ে এনেছি; ওয়েটার! এই শব্দটি যতটা না পেশার পরিচয়, তার চেয়ে বেশি আমাদের মানসিক সীমাবদ্ধতার প্রতীক।

আত্মবিরোধী সমাজের নির্মম বাস্তবতা

আমরা বিদেশে গিয়ে একই শিল্প দেখে মুগ্ধ হই। দুবাই, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুরের হোটেল দেখে প্রশংসা করি। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সেবা দেখে ভিডিও করি, ছবি তুলি, গর্ব করি। কিন্তু নিজের দেশে যখন একজন তরুণ এই শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তখন তাকে শুনতে হয়, মানুষ কী বলবে।এই প্রশ্ন আসলে সমাজের ভেতরের অশিক্ষিত অভিজাত্যতার বহিঃপ্রকাশ। যেখানে পেশার মর্যাদা নির্ধারিত হয় বাস্তবতা দিয়ে নয়, সামাজিক গুজব দিয়ে।

বিদেশি আধিপত্যের অস্বস্তিকর সত্য

বাংলাদেশের বড় বড় হোটেল, রিসোর্ট এবং পর্যটন খাতে বিদেশি শেফ, বিদেশি ম্যানেজার, বিদেশি কনসালট্যান্টের উপস্থিতি একটি পরিচিত দৃশ্য। প্রশ্ন হলো, তারা কি আমাদের চেয়ে বেশি মেধাবী?উত্তর খুব সহজ নয়, কিন্তু সত্যটা তেতো।সমস্যা মেধার নয়, সমস্যা সুযোগের ইতিহাসের। তারা এমন সমাজ থেকে এসেছে যেখানে হসপিটালিটি একটি সম্মানজনক এবং উচ্চ আয়ের পেশা। সেখানে একজন হোটেল ম্যানেজারকে ছোট করে দেখা হয় না, বরং নেতৃত্বের অবস্থানে রাখা হয়। আর আমরা এখনো পেশার নাম শুনে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করি।

শিক্ষা ব্যবস্থার নীরব ব্যর্থতা

আরও বড় সমস্যা হলো আমাদের শিক্ষা ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স সিস্টেম। স্কুল কলেজে বারবার বলা হয় ডাক্তার হও, ইঞ্জিনিয়ার হও, বিসিএস দাও। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই বলা হয় তুমি চাইলে একটি বৈশ্বিক পর্যটন শিল্পের অংশ হতে পারো। ফলে হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট অনেকের কাছে “শেষ অপশন” হয়ে যায়, “প্রথম পছন্দ” নয়। এই মানসিকতা থেকেই শুরু হয় পেশাগত অপচয়।

বাংলাদেশের আত্মঘাতী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের হাতে আছে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য অঞ্চল, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। এই সম্পদ কোনো পর্যটন শিল্প ছাড়া অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা সেই শিল্প গড়ার বদলে এখনো বিতর্ক করি এটি “ভালো ক্যারিয়ার কি না” ? এ যেন নিজের ঘরে সোনা রেখে বাইরে দারিদ্র্য খোঁজার মতো বাস্তবতা।

ওয়েটার তত্ত্ব: একটি সামাজিক রোগ

এই দেশে একটি অদৃশ্য তত্ত্ব কাজ করে। সেটি হলো ওয়েটার তত্ত্ব।এই তত্ত্ব অনুযায়ী, হোটেল মানেই ওয়েটার, রেস্টুরেন্ট মানেই সার্ভিস বয়, আর হসপিটালিটি মানেই নিম্ন মর্যাদা। এই তত্ত্বের কারণে একজন আন্তর্জাতিক হোটেল ম্যানেজার আর একজন সাধারণ সার্ভিস কর্মীকে একই বাক্সে রাখা হয়। এটি শুধু ভুল ধারণা নয়, এটি একটি কাঠামোগত অবিচার।

পরিবর্তনের সময় এখন

বিশ্ব এখন আর ডিগ্রি দেখে মানুষকে বিচার করে না, দক্ষতা দেখে। আজকের অর্থনীতি জিজ্ঞেস করে তুমি কী পারো, তুমি কী শিখেছো, তুমি কী তৈরি করতে পারো। কিন্তু আমরা এখনো জিজ্ঞেস করি তুমি কোথায় চাকরি করো? এই ব্যবধান যতদিন থাকবে, ততদিন হসপিটালিটি নয়, ক্ষতি হবে আমাদের অর্থনীতির।

শেষ কথা

হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট কোনো ছোট বিষয় নয়। এটি একটি বৈশ্বিক শিল্প, একটি নেতৃত্বের ক্ষেত্র এবং একটি অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। একজন হোটেল ম্যানেজার শুধু অতিথি সামলান না, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান চালান, একটি অর্থনীতি পরিচালনা করেন। তাই প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো এই শিল্পকে “ওয়েটার” শব্দে বন্দি রাখব? নাকি অবশেষে স্বীকার করব, সম্মান কাজের নয়, দৃষ্টিভঙ্গির। যেদিন এই স্বীকৃতি আসবে, সেদিনই “ওয়েটার তত্ত্ব” ভেঙে পড়বে। আর সেদিনই শুরু হবে একটি নতুন অর্থনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে পেশা ছোট নয়, মানসিকতা বড়।

লেখক- মোঃ মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।