ঢাকা | মে ১৯, ২০২৬ - ৯:৪০ অপরাহ্ন

নিউমোনিয়া শনাক্তকরণে আমার উদ্ভাবন ‘LungsAI’

  • আপডেট: Tuesday, May 19, 2026 - 8:13 pm

শাহেদ রহমান।। বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন আর কেবল গবেষণাগারের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষার বাস্তব হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিপ্রেমী একজন তরুণ হিসেবে সবসময় আমার ইচ্ছা ছিল এমন কিছু উদ্ভাবন করা, যা মানুষের উপকারে আসবে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। সেই স্বপ্ন থেকেই আমি তৈরি করেছি “LungsAI” নামের একটি ডিপ লার্নিং ভিত্তিক নিউমোনিয়া শনাক্তকরণ প্রযুক্তি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে নিউমোনিয়া এখনো একটি প্রাণঘাতী রোগ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। অনেক সময় এক্স রে রিপোর্ট বিশ্লেষণে দেরি হওয়ার কারণে রোগ শনাক্ত করতেও সময় লাগে। ফলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয় না। এই বাস্তব সমস্যাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। সেখান থেকেই “LungsAI” উদ্ভাবনের যাত্রা শুরু।

“LungsAI” মূলত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিউমোনিয়া ক্লাসিফায়ার, যা এক্স রে ইমেজ বিশ্লেষণ করে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে নিউমোনিয়া শনাক্ত করতে পারে। আমি এই প্রজেক্টে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছি, যা শুধু রোগ আছে কি না তা শনাক্ত করে না, বরং ফুসফুসের কোন অংশে সংক্রমণ ছড়িয়েছে সেটিও হিটম্যাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল আকারে দেখাতে সক্ষম। এর ফলে চিকিৎসকদের জন্য রোগ নির্ণয় আরও সহজ এবং কার্যকর হয়ে ওঠে।

এই প্রজেক্টটি ডেভেলপ করতে আমি পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করেছি এবং চিকিৎসকদের জন্য সহজ ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে এর ওয়েব ইন্টারফেস তৈরি করেছি স্ট্রিমলিট ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে। তবে এই সিস্টেমটির মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে ডিপ লার্নিংয়ের অত্যাধুনিক অ্যালগরিদম সিএনএন বা কনভোলিউশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক।

বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে সবচেয়ে সফল প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে সিএনএন অন্যতম। উন্নত বিশ্বের হাসপাতালগুলোতে ক্যান্সার শনাক্তকরণ, চোখের রেটিনা বিশ্লেষণ, এমআরআই ও সিটি স্ক্যান অ্যানালাইসিসে এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আমি আমার প্রজেক্টে সিএনএন ব্যবহার করেছি কারণ এটি মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণে একজন দক্ষ রেডিওলজিস্টের মতো কাজ করতে পারে। এক্স রে ইমেজের ভেতরের সূক্ষ্ম প্যাটার্ন, দাগ কিংবা ফুসফুসের অস্বাভাবিকতা যা অনেক সময় সাধারণ চোখে ধরা কঠিন, সিএনএন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। নিউমোনিয়ার কারণে ফুসফুসে যে ধরনের সংক্রমণ বা ফ্লুইড তৈরি হয়, সেই পিক্সেলভিত্তিক প্যাটার্নগুলো শিখে নিয়ে এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে।

এই প্রযুক্তিতে আমি রোগীর প্রোফাইল ব্যবস্থাপনাও যুক্ত করেছি। রোগীর নাম, বয়স, লিঙ্গ এবং রেফারেল আইডিসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা কিংবা কফ জমার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ ইনপুট দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। এসব তথ্য এবং এক্স রে বিশ্লেষণের ভিত্তিতে “LungsAI” স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বিস্তারিত মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যেই জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা ২০২৬ এর সিনিয়র ক্যাটেগরিতে আমার “LungsAI” প্রজেক্ট সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। পরবর্তীতে জেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে এবং খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এই অর্জন আমাকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে “LungsAI” কে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। দেশের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ আরও সহজ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ এর মাধ্যমে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পথচলায় তরুণদের উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমি মনে করি, আমাদের দেশের তরুণদের শুধু সঠিক সুযোগ এবং দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তাহলেই তারা বিশ্বমানের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

“LungsAI” শুধু আমার একটি প্রজেক্ট নয়, এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি স্বপ্ন। আমি চাই ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হোক, বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত হোক এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করুক। তরুণদের মেধা, প্রযুক্তি এবং মানবসেবার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক একটি উন্নত, আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ।

শাহেদ রহমান, শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।