ঢাকা | জুলাই ১৪, ২০২৬ - ৪:০৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বান্দরবানে বন্যায় ৭০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধ, ৭ জনের মৃত্যু; আশ্রয়কেন্দ্রে ২,৫৮২ মানুষ

  • আপডেট: Tuesday, July 14, 2026 - 12:14 pm

স্টাফ রিপোর্টার, বান্দরবান:

টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবান পার্বত্য জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দুর্যোগে এ পর্যন্ত পাহাড় ধস ও পানিতে ডুবে মোট ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ১২ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং ২ হাজার ৫৮২ জন মানুষ ৬৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জেলা প্রশাসন এসব তথ্য জানায়।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ২ মিলিমিটার। বন্যার মধ্যবর্তী সময়ে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বর্তমানে পানি কমতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার ৫ দশমিক ৪৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ৩ দশমিক ৭১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৪৭টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১১টি বড় আকারের। ভূমিধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় এসব সড়ক সচল করা হয়। লামা উপজেলায় দুটি পৃথক ভূমিধসের ঘটনায় ৫ জন নিহত হন। এছাড়া পানিতে ডুবে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

দুর্যোগে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডি ও স্থানীয় সড়কের প্রায় ৯০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪টি ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি চলাচলের উপযোগী করা হলেও বাকি তিনটির মেরামত কাজ চলমান রয়েছে।

জেলায় দুর্যোগ মোকাবেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও ৬৭টিতে মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণাধীন ভবনেও অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক এ দুর্যোগে ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসন জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ৪০০ টন চাল, ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এসব বরাদ্দ জেলার সাতটি উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী, ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য এবং ৩ লাখ টাকা নগদ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া পৌরসভার উদ্যোগে প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ দুর্গত মানুষের জন্য প্রতিদিন দুই বেলা রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে আরও ৩ হাজার ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে।

ত্রাণ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, বিএনপির কর্মী এবং ব্র্যাক, গ্রাউস, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

পর্যটন পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বন্যার সময় থানচিতে ১৬৭ জন এবং রুমায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। সর্বশেষ আমিয়াখুম এলাকায় আটকে পড়া চারজন পর্যটককে বিজিবি উদ্ধার করেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ সমন্বিতভাবে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিজিবি তাদের বিভিন্ন স্থাপনায় ১৩০টির বেশি পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেছে।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং সাপের কামড়ের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুদ রাখা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানায়, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করবেন। প্রত্যাবর্তনের সময় প্রতিটি পরিবারকে অন্তত দুই দিনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর মেরামতের জন্য ১ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য ৩ হাজার টাকা গৃহ মেরামত অনুদান চেয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ, পাহাড়ের পাদদেশ উপযোগী নিরাপদ আবাসন নির্মাণ, অবৈধ পাহাড় কাটা রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা এবং বান্দরবান পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ম্যাক্সি খাল সংস্কারের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।