পর্যটক কমেছে মিরসরাই-সীতাকুণ্ডের পর্যটনকেন্দ্রে
মিরসরাই প্রতিনিধি।।
পর্যটক কমেছে মিরসরাই-সীতাকুণ্ডের পর্যটনকেন্দ্রে।
পর্যটকের খরা যাচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে। বিগত কয়েক মাস ধরে তেল সংকট ও মূল্য বাড়ার কারণে যান চলাচল কমে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে বলে দাবি পর্যটনকেন্দ্রের ইজারাদারদের। তাদের দাবি, এখানে বেশিরভাগ পর্যটক দূর থেকে আসেন। মহাসড়কে আগের মতো যানবাহন চলাচল করছে না। অথচ প্রতি বছর এ সময়ে দুই উপজেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র শত শত মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল।
জানা গেছে, ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের তালিকায় আছে মিরসরাই-সীতাকুণ্ডের প্রায় ২০টি পর্যটনকেন্দ্র। এখানে একপাশে পাহাড়, আরেক পাশে নদী ও অন্য পাশে সাগর। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা একাধিক পাহাড়ি ঝরনার পাশাপাশি আছে বেশ কয়েকটি সমুদ্রসৈকত। কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা হয়েছে তিনটি হ্রদ ও তিনটি পার্ক। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকেরা একদিনে একসঙ্গে কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে পারেন।
এখানে আছে আট স্তরবিশিষ্ট খৈয়াছরা ঝরনা, নাপিত্তাছরা ঝরনা, রূপসী ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, হরিণাকুণ্ড ঝরনা, মেলখুম গিরিপথ, সোনাইছড়ি ঝরনা, বাঘবিয়ানী ঝরনা, বাঁশবাড়িয়া ঝরনাসহ ছোট-বড় অসংখ্য ঝরনা। আছে দেশের দ্বিতীয় কৃত্রিম লেক মহামায়া ইকোপার্ক, বাওয়াছরা, সোনাইছড়ি লেক।
ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আরশিনগর ফিউচার পার্ক, সোনাপাহাড় ফার্মহাউস রিসোর্ট, অলিনগর হিলসডেল মাল্টি ফার্ম ও মধুরিমা রিসোর্ট। আছে দেশের ষষ্ঠ সেচ প্রকল্প মুহুরি প্রজেক্ট। এ ছাড়া ডোমখালী সমুদ্রসৈকত, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বসুন্ধরা সমুদ্রসৈকত, আকিলপুর সমুদ্রসৈকত, গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত, বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত, নড়ালিয়া সমুদ্রসৈকত ও সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে মহামায়া ইকোপার্ক, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও ৫টি ঝরনা ইজারা দিয়েছে বনবিভাগ। অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র উন্মুক্ত হলেও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রে টিকিটের ব্যবস্থা আছে।
সরেজমিনে মহামায়া ইকোপার্কে দেখা গেছে, ছুটির দিন হলেও আশানুরূপ পর্যটক নেই। কিছু পর্যটক লেকের বাঁধে ও নৌকায় ভ্রমণ করছেন। অথচ ছুটির দিনে এখানে শত শত পর্যটকের আনাগোনা থাকার কথা। অলস বসে সময় কাটাচ্ছেন ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালক ও কায়াকিংয়ের মালিকেরা।
নৌকা চালক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘এখানে ছুটির দিনে প্রচুর মানুষ আসার কথা। দেখেন, সর্বোচ্চ ১০০ মানুষ হবে। ঈদের পর থেকে এমন অবস্থা চলছে। মনে হয় মানুষের কাছে তেমন টাকা-পয়সা নেই।’
কায়াকিংয়ের কাউন্টারে থাকা তানভীর হোসেন রাতুল বলেন, ‘আজ সকাল থেকে মাত্র ৮ জন কায়াকিংয়ে উঠেছেন। লেকে প্রায় ৬৬টি কায়াকিং বোট আছে। আমাদের বেতনও ঠিকমতো উঠছে না।’
মুহুরি প্রজেক্ট পর্যটন স্পটের দোকানদার মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘আগের মতো মানুষ নেই। বেচাকেনা কমে গেছে। আগে যে কোনো বন্ধের দিন অনেক মানুষ বেড়াতে আসত।’
খৈয়াছরা ঝরনা সড়কের পাশে একটি টং দোকানে বসে হাফপ্যান্ট, ক্যাপ, টুপি ও বাঁশের লাঠি বিক্রি করেন আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘সাধারণত ঝরনায় পানি হলে পর্যটক খুব বেশি হয়। এখন ঝরনায় পানি থাকার পরও পর্যটক তেমন আসছে না। বেচাকেনা অনেক কমে গেছে।’
মিরসরাই-সীতাকুণ্ডের ৫টি ঝরনা ইজারা পান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ আর এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এসএম হারুন বলেন, ‘প্রায় দেড় মাস ধরে তেমন পর্যটক নেই। আগে প্রতিদিন পর্যটক আসত। শুক্রবার, শনিবার ও যে কোনো ছুটির দিন মানুষ অনেক বেড়ে যেত। এখনো তেমন দেখা যাচ্ছে না।’
পর্যটক কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। তার মধ্যে কিছুদিন তেলের সংকট, এখন আবার তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়তে পারে। হয়তো বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হলে পর্যটক আসতে পারে।’
২০২৫ সালের জুলাই মাস থেকে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ২ কোটি ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ২৫০ টাকায় ১ বছরের জন্য মহামায়া ইকোপার্কের ইজারা পেয়েছেন ওয়াসিফা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘অবস্থা খুব খারাপ। এবার ইজারা নিয়ে লাভ তো দূরের কথা, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান হবে। ঈদের সময় ৩-৪ দিন ভালো পর্যটক হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গত এক মাসের বেশি সময় ধরে পর্যটকের খুব খরা চলছে। পর্যটক কমে যাওয়ার বিভিন্ন কারণের মধ্যে তেলের সংকট ও পরে মূল্য বৃদ্ধিও আছে। আমাদের প্রতিদিন ৫০০-এর চেয়ে বেশি পর্যটক হওয়ার কথা।’











