ঢাকা | মে ২৬, ২০২৬ - ৪:০০ অপরাহ্ন

নিরাপদ মাতৃত্বের চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বিদ্যমান

  • আপডেট: Tuesday, May 26, 2026 - 1:30 pm

ডেস্ক রিপোর্ট।। দেশে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ, প্রসব-পূর্ব প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়া, অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসব এবং অল্প বয়সে মাতৃত্বের কারণে এখনো আশানুরূপভাবে কমছে না মাতমৃত্যুর হার। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে এখনো ৫৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটে বাড়িতে। সেইসঙ্গে ৬১ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী অন্তত চারবার গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা পান না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৩’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লাখ জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো গর্ভকালীন যত্ন, পুষ্টি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও সুযোগের অভাব রয়েছে। মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণগুলো হলো—বাল্যবিবাহ, অপ্রাপ্তবয়স্ক মাতৃত্ব, অপুষ্টি এবং দারিদ্র্য। পাশাপাশি দক্ষ ধাত্রী ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের সংকট, পর্যাপ্ত হাসপাতালের অভাব, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সীমিত রেফারেল ব্যবস্থাও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে অন্তত চারবার গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিতে হয়। এই সেবার মধ্যে রয়েছে শারীরিক পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান এবং নিরাপদ প্রসব পরিকল্পনা।

তবে বিবিএসের তথ্য বলছে, দেশে মাত্র ৩৯ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী চারবার বা তার বেশি প্রসব-পূর্ব স্বাস্থ্যসেবা পান। অর্থাৎ ৬১ শতাংশ নারী এখনো এ সেবার বাইরে। গ্রামাঞ্চলে এ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে ৬৪ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রয়োজনীয় গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা পান না। শহরাঞ্চলে এ হার ৪৩ শতাংশ। এ ছাড়া ২ শতাংশ নারী জীবনে একবারও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা নেননি। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার কিছুটা কমলেও এখনো মোট প্রসবের ৩৬ শতাংশ হচ্ছে বাড়িতে। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৩৬ শতাংশ, যেখানে শহরে ২২ শতাংশ।

নিরাপদ মাতৃত্বের বড় ঝুঁকি হিসেবে বাড়ছে বাল্যবিবাহও। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে বিয়ের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৯ শতাংশ এবং শহরে ৭ শতাংশ। এ ছাড়া ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় ৪২ শতাংশ নারীর। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসবের হার এখনো সন্তোষজনক নয়। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন ২৬ শতাংশ মা। গ্রামাঞ্চলে এ হার ২৪ শতাংশ এবং শহরে ৩৪ শতাংশ।

এমন বাস্তবতায় আগামী ২৮ মে দেশে পালিত হতে যাচ্ছে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’। ১৯৯৮ সাল থেকে সরকার দিবসটি পালন করে আসছে নিরাপদ মাতৃত্ব ও নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।

এ বিষয়ে মেরী স্টোপস বাংলাদেশের লিড অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা মনজুন নাহার বলেন, ‘নিরাপদ মাতৃত্বের ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাল্যবিবাহ। ১৮ বছরের কম বয়সী নারীদের গর্ভধারণ মা ও গর্ভের শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত ন্যূনতম চারটি গর্ভকালীন চেকআপের মধ্যে প্রথমটি করেন ৬৪ শতাংশ নারী। কিন্তু দ্বিতীয় চেকআপে এ হার ১৫ শতাংশ কমে যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ চেকআপে আরও কমে আসে। দেশে প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হন। নিরাপদ মাতৃত্বকে এখনো অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এটি শুধু গ্রামের নয়, পুরো দেশের সমস্যা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, দেশের অনেক নারী পরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করেন না। গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শও নেন না। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড জটিলতা কিংবা অতিরিক্ত ওজনের মতো সমস্যা নিয়েই তারা গর্ভধারণ করেন। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা না নেওয়ায় মা ও গর্ভের সন্তানের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বাংলাদেশে ৫৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটে বাড়িতে। বাড়িতে কোনো প্রসূতির মৃত্যু হলে তার কারণ অনুসন্ধান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দক্ষ ধাত্রী নিয়োগ, জরুরি রেফারেল ব্যবস্থা উন্নত করা এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামীদ বলেন, নিরাপদ মাতৃত্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা অপুষ্টি। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ হয় না। প্রশিক্ষিত সেবাকর্মীর সহায়তা ছাড়া সন্তান প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই দম্পতিদের কাউন্সেলিং প্রয়োজন।

অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যকার্ড চালু করা যেতে পারে। কার্ডে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। সেখানে একটি অংশ গর্ভবতীর পুষ্টি নিশ্চিতের জন্য থাকবে। বাকিটা নিয়মিত চেকআপ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ থাকবে। এই কার্ড থাকলে টাকার জন্য কাউকে চিকিৎসা বা সেবা বঞ্চিত হতে হবে না। এতে মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।