ঢাকা | জুলাই ২৭, ২০২৬ - ১০:০৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

৩৬ বছর ধরে পত্রিকার ফেরিওয়ালা মো. হোসেন: ডিজিটাল যুগে টিকে থাকার নীরব সংগ্রাম

  • আপডেট: Monday, July 27, 2026 - 8:19 pm

কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি:

রাঙামাটির কাপ্তাই, রাজস্থলী উপজেলা এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকায় সংবাদপত্রপ্রেমীদের কাছে পরিচিত এক নাম মো. হোসেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে পত্রিকার হকার হিসেবে কাজ করলেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁর ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। মাথা গোঁজার মতো একটি ছোট্ট আশ্রয় ছাড়া তেমন কোনো সঞ্চয় বা নিরাপত্তা গড়ে তুলতে পারেননি তিনি। তবুও সংবাদপত্রের প্রতি ভালোবাসা আর পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে আজও প্রতিদিন ভোরে পথে নামায়।

চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান এলাকার একটি মাত্র ৭ ফুট বাই ৪ ফুটের দোকানের বারান্দায় বসেই চলে তাঁর পত্রিকা বিক্রির কার্যক্রম। প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে নিজের পুরোনো সাইকেলে চড়ে লিচুবাগান, বড়ইছড়ি, কেপিএম, রেশমবাগান, চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজার, মিশন হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠকের হাতে পৌঁছে দেন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা।

সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে লিচুবাগানে তাঁর ছোট্ট দোকানে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মো. হোসেন বলেন, “আজ থেকে ৩৬ বছর আগে একজন ডিলারের মাধ্যমে কমিশনের ভিত্তিতে পত্রিকা বিক্রি শুরু করি। তখন দৈনিক আয় ছিল গড়ে ১০০ টাকার মতো। দুই বছর পর নিজেই পত্রিকার ডিলার হই। একসময় প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কপি পত্রিকা বিক্রি করতাম। এখন ডিজিটাল যুগে সেই সংখ্যা কমে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ কপিতে নেমে এসেছে।”

তিনি আরও বলেন, “একসময় দিনে প্রায় তিন হাজার টাকা আয় হতো। এখন ৫০০ টাকা আয় করাও কঠিন হয়ে যায়। অন্য কোনো কাজ জানি না বলেই এই পেশাকেই আঁকড়ে ধরে আছি। আমার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেরা কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। কিন্তু পত্রিকা বিক্রি আমার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি এক ধরনের নেশাও।”

কাপ্তাই প্রেসক্লাবের সভাপতি কবির হোসেন বলেন, “মো. হোসেন অত্যন্ত আন্তরিক ও দায়িত্বশীল মানুষ। যখনই পত্রিকা প্রয়োজন হয়, ফোন দিলেই দ্রুত পৌঁছে দেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।”

রাঙ্গুনিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মো. আলী, বর্তমান সভাপতি মো. ইলিয়াস তালুকদার এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ নাসির বলেন, “প্রায় ৩৬ বছর ধরে তিনি এই পেশায় রয়েছেন। প্রতিদিন সকালে তাঁর দোকানে গিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো এক নজর দেখে দিনের শুরু করি। তিনি আমাদের কাছে একজন নির্ভরযোগ্য সংবাদবাহক।”

রাঙ্গুনিয়ার কোদালা এলাকার ব্যবসায়ী মো. আজিজ এবং চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজারের চিকিৎসক ডা. বি. কে. দেওয়ানজী বলেন, “আমরা প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁর কাছ থেকেই নিয়মিত পত্রিকা সংগ্রহ করছি। সময়মতো পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কখনোই অবহেলা করেন না।”

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে সংবাদপত্রের পাঠক ও বিক্রি কমে গেলেও মো. হোসেনের মতো কিছু মানুষ এখনো নিষ্ঠার সঙ্গে সংবাদপত্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁদের এই নিরলস পরিশ্রমই আজও মুদ্রিত সংবাদপত্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নীরব ভূমিকা রেখে চলেছে।