ঢাকা | জুন ৪, ২০২৬ - ৮:২৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছেন, যমজ দুই ছেলেকে বাঁচাতে পারলেন না বাবা

  • আপডেট: Thursday, June 4, 2026 - 6:18 pm

মিরসরাই প্রতিনিধি

‘স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এনজিও—কারও কাছে হাত পাততে বাকি রাখিনি। সব মিলিয়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করেছি। ছেলেদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছি, তবু বুকের দুই ধনকে বাঁচাতে পারলাম না।’

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন হারুনুর রশিদ। হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ দিনের ব্যবধানে তাঁর এক বছর বয়সী যমজ দুই ছেলের মৃত্যু হয়েছে। সন্তানদের চিকিৎসার প্রায় সব টাকাই তিনি ঋণ করে খরচ করেছেন। এখন এ ঋণের বোঝা আর শোক একসঙ্গে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

হারুনুর রশিদ চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রীর নাম ইসরাত জাহান। এ দম্পতির ঘর আলো করে যমজ দুই সন্তানের জন্ম হয়েছিল গত বছরের ১৬ এপ্রিল। একজনের নাম রেখেছিলেন আবদুল্লাহ আল ফাহিম, আরেকজনের আবদুল্লাহ আল নোমান। মারা যাওয়া এ দুই সন্তানের বাইরে হারুনুর-ইসরাত দম্পতির ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।

যমজ সন্তানের মধ্যে গত ২২ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে আবদুল্লাহ আল নোমানের মৃত্যু হয়। এরপর গত মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আবদুল্লাহ আল ফাহিমের। গতকাল বুধবার রাত ১১টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে হারুনুর রশিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে স্বজনদের ভিড়। একপাশে নির্বাক বসে আছেন মা ইসরাত জাহান। ঘরের ভেতরে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী শিশু দুটির মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করছেন। হারুনুর রশিদ জানান, জন্মের পর থেকেই দুই ছেলে ছিল বেশ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত। চলতি বছরের ৮ মার্চ ফাহিমের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৮ মার্চ তার হাম শনাক্ত হয়।

সেবার ফাহিম কিছুটা সুস্থ হলে ২৫ মার্চ বাড়ি নিয়ে আসা হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যে আবার তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। পরে তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি নোমানেরও হামের উপসর্গ দেখা দেয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর তারও হাম শনাক্ত হয়। এরপর ২২ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নোমানের মৃত্যু হয়।

এদিকে হামের পর সৃষ্ট নানা জটিলতায় ফাহিমের অবস্থারও দিন দিন অবনতি হতে থাকে। নোমান মারা যাওয়ার পরের দিন ফাহিমকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সংকট থাকায় তিন দিন পর নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় ফাহিমকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।

নিজের দুই সন্তানের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। চার বোনের পর আমি পরিবারের একমাত্র ছেলে। বাজারে ছোট একটা মুদিদোকান করে কোনোমতে সংসার চালাই। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য গত তিন মাস দোকান খুলতে পারিনি। ধারদেনা করে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করেছি। হাসপাতালে না খেয়ে থেকেছি আমরা। টাকা খরচ হলেও যদি ছেলেদের ফিরে পেতাম, কোনো আফসোস থাকত না। এখন আমাকে দেনার মধ্যে ফেলে দুই বুকের ধন চলে গেছে।’

হারুনুর রশিদের প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বাচ্চা দুটি খুবই সুন্দর আর হাসিখুশি ছিল। এলাকার সবাই তাদের খুব আদর করত। একই পরিবারের দুই শিশুর এমন মৃত্যু আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছে। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’