ঢাকা | মে ৯, ২০২৬ - ৯:৩৫ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

সবজির বাজারে আগুন, মাছ ডিম মাংসও নেই নাগালে

  • আপডেট: Friday, May 8, 2026 - 5:52 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক।। নানা অজুহাতে সবজির অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা। তাদের দাবি, টানা বৃষ্টি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও মৌসুম শেষ হওয়ার আড়ত থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ সবজির কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার ঘরে।

শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি দামের সবজির তালিকায় রয়েছে কাঁকরোল, শসা ও বেগুন, যেগুলোর কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
সীমিত আয়ের মানুষেরা বলছেন, রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে তাদের নাভিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে
বাজারে প্রতি কেজি পটল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, কাঁকরোল প্রতি কেজি ১২০ টাকা, বেগুন (গোল) প্রতি কেজি ১২০ টাকা, বেগুন (লম্বা) প্রতি কেজি ১০০ টাকা, দেশি শসা প্রতি কেজি ১২০ টাকা, হাইব্রিড শসা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, ঝিঙা প্রতি কেজি ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া ধুন্দল প্রতি কেজি ১০০ টাকা, ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৫০ টাকা, জালি প্রতি পিস ৬০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের একজন ক্রেতা আমিনুর রহমান বলেন,‘ বাজারে এলে মনে হয় পকেট ডাকাতি হচ্ছে। সবজির চড়া দাম শুনে যখন ডিম কিনতে গেলাম, দেখি সেখানেও আগুন। গত সপ্তাহে যে ডিম ১৩০ টাকা ডজন কিনলাম, আজ তা ১৫০ টাকা চাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এখন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। চড়া দামের কারণে ভালো মাছ-মাংস, এমনকি সোনালি মুরগিও বাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এখন ব্রয়লার, পাঙাশ বা ডিম ভর্তাও খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
সাইফুল আলম নামে আরেকজন ক্রেতা বলেন, সব ধরনের সবজির দাম বাড়তি। এত বেশি দামে সাধারণ মানুষের সবজি কিনে খাওয়া অনেকটাই কঠিন। আজকে বাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। কিছুদিন আগেও পেঁপের দাম কম থাকলেও এখন এটা বাড়তি দামের সবজি। আজ প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা করে। শসা, করলা, বেগুন, কাঁকরোল প্রতি কেজি ১২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে সবজির দাম বাড়তি যাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো সবজি পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে, এ ছাড়া কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির কারণে কৃষকের সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চাহিদার তুলনায় বাজারে সবজি সরবরাহ তুলনামূলক কম। সব মিলিয়ে সবজির দাম বাড়তি যাচ্ছে।
এ ছাড়া বেশ কিছু সবজির মৌসুম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সে কারণেও সবজির সরবরাহ কিছুটা কম। সবজির দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের মতো খুচরা ও ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়ে গেছে, আমাদের বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
এদিকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে মুনাফা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকটের নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানে এখনো তেল মিলছে না। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর চিনি ও মসুর ডালের মতো বেশ কিছু অতি প্রয়োজনীয় মুদি পণ্যের দাম বেড়েছে।
একই সঙ্গে বাজারের প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলা, পোলাওয়ের চালসহ আরও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে গত দু-তিন সপ্তাহে।

এদিকে সপ্তাহ ব্যবধানে বেড়েছে চাল ও মুরগির ডিমের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে বেড়েছে অন্তত ১৫ থেকে ২০ টাকা। চালের দামও কেজিতে বেড়েছে ১ থেকে ২ টাকা। প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। আগে এই ডিম ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় মিলতো। আর গত রোজার মধ্যে ছিল ১১০ টাকা ডজন।
বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ সংকটের কারণেই দাম বেড়েছে।
ডিম বিক্রেতা রাশেদ বলেন, বাজারে ডিমের সরবরাহ কমে গেছে। সেই কারণে পাইকারিতেই দাম বাড়তি রয়েছে। আমরা বাধ্য হয়েই খুচরায় বেশি দামে বিক্রি করছি।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দামও বাড়তি। সবজির দাম বেশি হওয়ায় মানুষ এখন ডিম বেশি কিনছে। গত দুদিনে লাফিয়ে লাফিয়ে ডিমের দাম বেড়ে এখন ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। তবে সে তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম ঠিক আছে।
মুরগির বাজারে অবশ্য সোনালি মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও বেড়েছে অন্যান্য জাতের মুরগি। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়, দেশি মুরগি কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ৭৮০ টাকায়, সোনালি মুরগি ৩৫০ টাকায় এবং লেয়ার মুরগি ২০ টাকা বেড়ে ৩৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে নিত্যপণ্যের অন্যান্য বাজারেও দেখা দিয়েছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। সপ্তাহ ব্যবধানে কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। খোলা আটা ও ময়দার দামও কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা আটা ৫৫ টাকা এবং খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কেজিতে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এলাচের দাম। বর্তমানে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ টাকায়, যা আগে ছিল ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যখনই সবজির দাম বাড়ে, তখন নিম্নআয়ের মানুষ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ডিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে বাজারে ডিমের দাম হু হু করে বাড়ছে। আরেক প্রোটিনের উৎস ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮৫-১৯০ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগি ৩৪০-৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে বাজারে চালের দামের চিত্রও উদ্বেগজনক। সারাদেশে বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হলেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব নেই। বরং খুচরা পর্যায়ে মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণ বলছে, এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ৪ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি।

ভোজ্যতেলের বাজারেও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে লিটার ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহকারীরা তাদের লাভের অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। লিটারপ্রতি মাত্র ২ টাকা লাভে তেল বিক্রি করতে অনীহা দেখাচ্ছেন ছোট দোকানিরা। ফলে অনেক পাড়া-মহল্লার দোকানে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে গেছে।

অন্যদিকে গত রমজানের পর থেকেই গরুর মাংসের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস মানভেদে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির মাংসের জন্য ক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে প্রতি কেজি ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা।
মাছের বাজার এখন আরও চড়া। চাষের মাছ থেকে শুরু করে নদ-নদীর মাছ—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলা মাছের দাম ঠেকেছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো সাধারণ মাছগুলোও এখন ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে মাছ কিনতে আসা গৃহিণী রেহানা পারভীন বলেন, এখন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে শুধু ঘুরতে হয়, ব্যাগে ভরার মতো সাশ্রয়ী কিছু আর নেই। বাজারে মাছ-মাংসের দাম এতো বাড়ছে যে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।