বৃষ্টির অযুহাতে সবজি মাছ ডিম-মুরগির দাম চড়া, স্বস্তি নেই ক্রেতাদের
নিজস্ব প্রতিবেদক।। টানা বৃষ্টির অযুহাতে রাজধানীতে বেড়েছে সবজির দাম। মান ও আকারভেদে বিভিন্ন সবজি ১০ থেকে ৪০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। সেই সঙ্গে বেড়ে মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম। ব্যবসায়ীদের দাবি, টানা বৃষ্টিসহ সরবরাহ ঘাটতির থাকায় দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে বৃষ্টি কমলে সরবরাহ বাড়বে। এতে দামও কমে যাবে।
শুক্রবার রাজধানীর রামপুরা, খিলগাও, সিপাহীবাগ, বনশ্রীসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি থাকলেও বাজারে ক্রেতাদের ভিড় অন্য দিনের মতোই দেখা গিয়েছে।
বাজারগুলোতে করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পটল প্রকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন প্রকারান্তরে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, সজনে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা এবং ধুন্দল হাইব্রিড ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
টমেটো প্রকারভেদে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, মুলা ৭০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ টাকা এবং লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে। এসব বাজারে কাঁচামরিচ কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা এবং হাইব্রিড ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
এদিকে বাজারগুলোতে এক হালি লেবু ১৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি ধনে পাতা ২৫০ টাকা এবং হাইব্রিড ধনেপাতা ১৮০ কেজি, কাঁচা কলা হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়, চাল কুমড়া ৬০ টাকা পিস এবং ক্যাপসিকাম ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে বর্ষাকাল হওয়ার বাজারে শাকের সরবরাহ বেশি। লাল শাক প্রতি আটি ১০ টাকা। পুইশাক ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি আটি। কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকায়।
বিক্রেতাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির কারণে ক্ষেত নষ্ট হয়েছে এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ঢাকায় সবজির ট্রাক কম আসছে। ফলে বাজার কিছুটা চড়া রয়েছে।
মালিবাগ বাজারের নিয়মিত ক্রেতা জয়নাল আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আকাশে মেঘ দেখলেই পণ্যের দামের পারদ ওপরে উঠে যায়। বৃষ্টি হলে নাকি মাল আসে না, অথচ বাজারে এসে দেখি কোনো সবজির ঘাটতি নেই। সব দোকানেই ভরপুর মাল, শুধু দামটাই বাড়তি।’
রামপুরা বাজরের ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. তসলিম হোসেন বলেন, ‘টানা বৃষ্টির অযুহাত দেখিয়ে সবজির দাম অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ডিম, মাছ আর মুরগির দামও অনেকটাই বাড়তি। ফলে মোট বাজার খরচ কমেনি।’
বনশ্রী কাঁচাবাজারে আসা ক্রেতা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতা কিছুটা কম ছিল। তবে সবজির পাশপাশি মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম এখনও বেশি। বিশেষ করে ইলিশ ও অন্যান্য দেশি মাছ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।’
চালের দাম নতুন করে বাড়েনি। আগের দামেই কেজি ৩ টাকা বেশি দিয়ে কিনছেন ক্রেতারা। মিনিকেট চালের দাম ৭৫ টাকা। মোটা চাল ৫৫-৬০ টাকা। নাজিরশাইল চাল ৯০ টাকা। চিনিগুড়া চালের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।
বাজারগুলোতে গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এবং খাসির মাংস ১৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
মুরগির বাজার ঊর্ধ্বমুখী
মুরগির বাজারেও রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। পাকিস্তানি সোনালি মুরগির কেজি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা। পাকিস্তানি হাইব্রিড জাতের মুরগি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকায়। পাকিস্তানি লেয়ার মুরগির দাম গত সপ্তাহের মতোই ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা রয়েছে। আর দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে।
মুরগি বিক্রেতা মো. মাসুদ হোসেন বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতা কিছুটা কম এসেছে। তবে মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। খামার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই খুচরা বাজারেও দাম কিছুটা বেশি রাখতে হচ্ছে।’
সিপাহীবাগ বাজারের ব্রয়লার মুরগির বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কিছুটা কম। যে কারণে দাম একটু বেড়েছে।’
একই কাঁচাবাজারের আরেক বিক্রেতা বলেন, ‘টানা বৃষ্টি হলে অনেক মুরগি মারা যায়। খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতি পোষাতে খামারিরা বাড়তি দামে মুরগি বিক্রি করে থাকেন।’
বেড়েছে ফার্মের ডিমের দাম
বেশ কিছুদিন ধরেই একেবারেই কমে যাওয়া ফার্মের মুরগির ডিমের দামও বেড়েছে। প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত দামে। যা গত সপ্তাহে ছিল ১১৫ থেকে ১২৫ টাকার মধ্যে। হাঁসের ডিম এক ডজন ২০০ থেকে ২২০ টাকা, দেশি মুরগির ডিমের হালি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, খামার পর্যায়ে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ কম থাকায় ডিম ও মুরগির দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে। একই সঙ্গে নদীতে দেশি মাছের সরবরাহ কম থাকায় বেশ কয়েকটি মাছের দাম এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই
বাজারে ইলিশ ৩০০ গ্রাম ওজনের এক কেজি মাছ ১১০০ টাকা থেকে ১২০০ এবং ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশের কেজি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। আর এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা।
বড় আকারের রুই বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, চিংড়ি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, ট্যাংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, কৈ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে। তবে চাষের তেলাপিয়া, পাঙাশ, শিং ও মাঝারি আকারের রুইয়ের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
মাছ বিক্রেতা মো. শাহ আলম বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে মাছের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট নেই। কিছু দেশি মাছ ও ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় সেগুলোর দাম বেশি। চাষের তেলাপিয়া, পাঙাশ ও মাঝারি রুইয়ের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। আমরা পাইকারি বাজার থেকে যে দামে মাছ কিনছি, সেই অনুযায়ীই বিক্রি করছি।’
ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন বাজেট কার্যকরের প্রভাবে মসলাসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে বাজারে আরও কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
মসলার বাজার
মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। দেশি রসুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আমদানিকৃত রসুন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং আদা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ ক্রেতা এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৃষ্টির কারণে সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও বাজারে যে হারে দাম বাড়ানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। নিয়মিত এবং কঠোর বাজার মনিটরিং না থাকার কারণেই অসাধু ব্যবসায়ীরা আবহাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন।











