ঢাকা | জুন ৫, ২০২৬ - ৮:৫২ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বাড়ল চালের দাম, স্বস্তি নেই সবজিতে

  • আপডেট: Friday, June 5, 2026 - 6:29 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক।। রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারগুলোতে বেড়েছে চালের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ঈদ শেষ হলেও পুরো চেহারায় ফিরেনি ঢাকা। ফলে রাস্তা-ঘাট ও হাট-বাজার অনেকটাই ফাঁকা। এরপরও স্বস্তি নেই সবজির বাজারে।

বাজারে প্রতিকেজি আটাশ চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮ থেকে ৭২ টাকায়, আগে ছিল ৬৬ থেকে ৬৭ টাকা। নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮০ টাকায়, আগে ছিল ৬৫ থেকে ৭৮ টাকা।

মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, এলসি বন্ধ থাকায় ভারতীয় চালের আমদানি কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। ভারতীয় চাল আসা কমে গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। সেই কারণেই দাম একটু বাড়ছে। শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে বাজারে প্রতি কেজি করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ থেকে ৫০ টাকা, পটল ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কচুরমুখী ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দাম মানভেদে ৬০ থেকে ১২০ টাকা এবং কচুর লতির দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। এ ছাড়া টমেটো ৮০ থেকে ১০০ টাকা, মূলা ৭০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ টাকা এবং লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পেঁপে ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। লেবুর দামও কিছুটা কমেছে। বাজারে এক হালি লেবু এখন বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ২০ টাকায়। দেশি ধনেপাতা ২৫০ টাকা, হাইব্রিড ধনেপাতা ১৮০ টাকা কেজি এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেপসিকামের দাম কেজিতে ৩২০ টাকা।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে।
শাকের বাজারে লাল শাকের আঁটি ১৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ টাকা, কলমি শাক দুই আঁটি ২০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ টাকা এবং ডাটা শাক দুই আঁটি ২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি টমেটো ১৪০ থেকে ১৭০ টাকা, দেশি গাজর ১৬০ টাকা, চায়না গাজর ১৮০ টাকা, লম্বা বেগুন ৭০ থেকে ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ৮০ টাকা, কালো গোল বেগুন ১০০ টাকা, শিম ৩২০ টাকা, শজনে ১৮০ টাকা, দেশি শসা ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, উচ্ছে ও করলা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা, হাইব্রিড পটোল ৮০ টাকা ও দেশি পটোল ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধুন্দল ৭০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০ টাকা, মূলা ৮০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৪০ টাকা ও ধনেপাতা ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে হাইব্রিড শসা ও পেঁপে ৮০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে।

আকারভেদে প্রতিটি লাউ ৮০ টাকা, চাল কুমড়া ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ফুলকপি ৭০ টাকা ও বাঁধাকপি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। প্রতি হালি কাঁচা কলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং লেবু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বাজারে আসা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের ক্রেতারা বলছেন, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারে এসে কাটছাঁট করেও প্রয়োজনীয় সওদা করা যাচ্ছে না। এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাজারে মানুষ কম, বিক্রি কম, তাহলে দাম কমছে না কেন? সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই আজব নিয়ম দুনিয়ার কোথাও নেই।”

খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, দাম বাড়ানোর পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। পাইকারি বাজার থেকেই তাদের চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। উপরন্তু, বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে দ্বিগুণ লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
সবজি ব্যবসায়ী সালাম হোসেন বলেন, এখন ক্রেতা কম। আবার পাইকাররাও পুরোপুরি বাজারে ফেরেননি। ফলে সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এজন্য দাম কিছুটা বেশি।

সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকলেও আলু-পেঁয়াজের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা, ক্রস জাতের পেঁয়াজ ৪০ টাকা এবং লাল ও সাদা আলু ২৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়া দেশি রসুন ৯০ থেকে ১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, চায়না আদা ১৮০ টাকা ও ভারতীয় আদা ১৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।

নিত্যপণ্যের বাজারের ঊর্ধ্বগতির পর এবার সাধারণ মানুষের পুষ্টির প্রধান উৎস মাছের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাজারে গিয়ে পছন্দের মাছ কিনতে না পেরে খালি হাতে কিংবা কাটছাঁট করে সামান্য পরিমাণ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন মধ্য ও নিম্নবিত্তরা। বাজারের এই ‘আগুনে দামে’ ভোক্তাদের পাতে এখন আমিষের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

মাছের বাজারে সরবরাহ থাকলেও দাম এখনো বেশ চড়া। আকার ও ওজনভেদে ইলিশ মাছ দুই হাজার ৩০০ থেকে তিন হাজার টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, কাতল ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, কালিবাউশ ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং চিংড়ি ৮০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া কাঁচকি ৫০০ টাকা, কৈ ২৬০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, টেংরা ৭০০ টাকা, বেলে ৭০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা এবং বোয়াল মাছ ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বাজারে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবজির বাজার তো আগেই শেষ, ভেবেছিলাম একটু মাছ বা মাংস নেব। কিন্তু বাজারে এসে দেখি হাত দেওয়ার উপায় নেই। বাচ্চার মুখে একটু প্রোটিন তুলে দেব, সেই উপায়ও আর রাখেনি বাজার সিন্ডিকেট। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো মিল নেই।’

এদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে কমেছে পোলট্রি মুরগির দাম। তবে বেড়েছে ডিমের দাম। ব্রয়লার মুরগির প্রতি কেজি কিছুটা কমে ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্তানি সোনালি মুরগি ৩২০-৩৩০ টাকা থেকে কমে ৩০০-৩১০ টাকা, পাকিস্তানি হাইব্রিড জাতের মুরগি ২৯০-৩০০ টাকা থেকে কমে ২৭০-২৮০ টাকা, পাকিস্তানি লেয়ার গত সপ্তাহের মতোই ৩৩০-৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০-৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
শান্তিনগর ফুটপাতের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে করলা, কাঁচামরিচ, আলু ও পেঁয়াজ বিক্রি করেন আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ভোরে নরসিংদী থেকে কলা নিয়ে আসি। স্বাভাবিক দিনে ভালো বিক্রি হয়, কিন্তু ঈদের ছুটিতে মানুষ নেই বললেই চলে। আজও (গতকাল) খুব কম বিক্রি হয়েছে।’

মালিবাগের বাসিন্দা রাজন মিয়া বলেন, ‘ঢাকায় মানুষ কিছুটা কম থাকায় এর প্রভাব বাজারেও দেখা যাচ্ছে। সাধারণ দিনের তুলনায় আজ অনেক ফাঁকা। দ্রুত বাজার করে চলে যেতে পারছি।’

মিরপুরের বিভিন্ন সড়কের পাশে থাকা অস্থায়ী কাঁচাবাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। সবজি, মাছ ও ফলের দোকানগুলোতে বিক্রেতারা অপেক্ষা করলেও ক্রেতা ছিল হাতে গোনা। অনেক দোকান পুরোপুরি বন্ধও দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিই নয়, বরং সরবরাহ চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং নিয়মিত বাজার তদারকির অভাবেই দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পুষ্টির সুরক্ষায় মাছ ও মাংসের বাজারে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সরবরাহ বা চাহিদার কোনো ঘাটতি নেই। মূলত অসাধু সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং তদারকি সংস্থার দুর্বল নজরদারির কারণেই বাজারের এই ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি। বাজার নিয়ন্ত্রণে শুধু খুচরা পর্যায়ে নয়, বরং পাইকারি আড়ত ও করপোরেট সরবরাহকারীদের ওপরও কঠোর নজরদারি চালানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।