ঢাকা | মে ১৯, ২০২৬ - ১০:৩৪ অপরাহ্ন

‘আদিবাসী’ শব্দার্থের জটিলতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা

  • আপডেট: Tuesday, May 19, 2026 - 8:11 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাজার হাজার নেতাকর্মীর আইনি লড়াইয়ে সম্মুখসারির যোদ্ধা এবং বর্তমান জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সম্প্রতি এক বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। নেত্রকোনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ সম্প্রতি তার নির্বাচনী এলাকার গারো, হাজং ও কোচ অধ্যুষিত অঞ্চল পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে ‘আদিবাসী’ ও ‘আদি বাসিন্দা’ হিসেবে সম্বোধন করেন। একই সাথে তিনি মন্তব্য করেন, ‘তারাই এখানকার আদি বাসিন্দা। আমরা বাঙালরা এখানে এসে তাদের জায়গা দখল করেছি।’

 

দলীয় প্রধানের বিশ্বস্ত ও একজন উচ্চশিক্ষিত আইনজ্ঞের মুখ থেকে নিঃসৃত এই বক্তব্যকে ইতিহাস, সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ক্ষতিকর হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। জনতুষ্টিবাদ (Populism) কিংবা অসচেতনতাবশত দেওয়া এই বক্তব্য কেন বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

 

একজন প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনের জটিলতাগুলো ব্যারিস্টার কায়সার কামালের অজানা থাকার কথা নয়। আদিবাসী বিষয়ক আন্তর্জাতিক দুটি প্রধান দলিল হচ্ছে— ILO Convention: 169 এবং UNDRIP (জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণা বা চার্টার)।

 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই সনদগুলোতে স্বাক্ষর করেনি। কারণ, আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ধারা অনুযায়ী কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ (Indigenous) হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তাদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ (Self-determination) দিতে হয়। এর ফলে তারা নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব, আলাদা বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার পায়, যা যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকিস্বরূপ।

 

আদিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত অনেক উন্নত রাষ্ট্রও এই কনভেনশনগুলো পুরোপুরি মেনে নেয়নি। এমনকি অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও পার্লামেন্টে সেদেশের মূল বাসিন্দাদের সংবিধানে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়ার বিল বিপুল ভোটে (রেফারেন্ডামের মাধ্যমে) প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: “রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করিবেন।”

 

রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় এদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো সম্প্রদায়কে যেন ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন না করা হয়। একজন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে, যিনি সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন, তাঁর মুখে সাংবিধানিক পরিভাষার বাইরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দ উচ্চারণ আইনি ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

 

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিএনপির একজন সাচ্চা জাতীয়তাবাদী সৈনিক। দেশীয় ঐতিহ্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল ভিত্তি। বিএনপির দলীয় গঠনতন্ত্র, রাজনৈতিক দর্শন এবং নির্বাচনী ইশতেহারে সবসময় দেশের অখণ্ডতা এবং সকল নাগরিকের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র অধিকারের কথা বলা হলেও, রাষ্ট্রকে ঝুঁকিতে ফেলে কোনো ‘আদিবাসী’ তকমা দেওয়ার নীতি দলটির আদর্শের পরিপন্থী।

 

নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্যের আলোকেও ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যটি সত্য-বিবর্জিত:-

 

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে মানব বসতির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের প্রাচীন। গাঙ্গেয় বদ্বীপের এই অঞ্চলে বাঙালিরাই এই ভূমির আদি সন্তান।

 

নেত্রকোনা অঞ্চলে বসবাসকারী গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায় কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা, বম, মুরং, লুসাই, খিয়াং, চাক খুমী, পাঙ্খোয়া সহ অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের কেউই এই ভূমির আদি বাসিন্দা বা ‘ভূমিপুত্র’ নয়। প্রমাণিত ইতিহাস অনুযায়ী, এরা বিভিন্ন সময়ে (প্রধানত মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, মিয়ানমার এবং ভারতের আসাম-ত্রিপুরা থেকে) রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আশ্রয়ের সন্ধানে এই ভূখণ্ডে অভিবাসিত হয়েছে।

 

ট্রাইবালদের উচ্চারিত অবমাননাকর শব্দ ‘বাঙাল’ নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে ডেপুটি স্পিকার প্রকারান্তরে বাঙালিদের এই ভূমিতে ‘বহিরাগত’ বা ‘দখলদার’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা ঘোরতর ঐতিহাসিক অসত্য।

 

সুতরাং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে আনীত মিথ্যা মামলাগুলো যেভাবে বীরত্বের সাথে লড়েছেন, সংসদ পরিচালনায় যেভাবে নিরপেক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন- তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু জনতুষ্টিবাদের জোয়ারে ভেসে কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক লাভের আশায় রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে এমন বক্তব্য তার মতো ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে অনভিপ্রেত। আশা করি, একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও আইনজ্ঞ হিসেবে তিনি এই ঐতিহাসিক ও আইনি ত্রুটিটি অনুধাবন করবেন। জাতীয় স্বার্থ, সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শের খাতিরে তিনি দ্রুতই এই অসচেতন বক্তব্য সংশোধন করে নেবেন- এটাই সচেতন দেশপ্রেমিক মহলের প্রত্যাশা।

 

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, প্রয়াত সার্কেল চীফ ও বোমাং রাজা অংশৈ প্রু চৌধুরী সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- আমরা আদিবাসী নই, আমরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী| আমাদের আদিনিবাস মায়ানমার| আমরা মায়ানমার থেকে এই দেশে এসেছি|” তাঁর এই বক্তব্য বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় এখনো বহুলভাবে প্রচারিত হয়ে আসছে|

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও সামাজিক পরিচয় ঠিক কী হবে- ‘আদিবাসী’ নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’- তা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে| তবে ইতিহাস এবং বিভিন্ন সময়ে দেওয়া পাহাড়ী অঞ্চলের শীর্ষ রাজনৈতিক ও প্রথাগত নেতাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” হিসেবেই উল্লেখ বা মেনে নিয়েছেন|

 

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়| চুক্তি স্বাক্ষরকালীন এবং পরবর্তী সময়ে জেএসএস-এর সভাপতি জ্যোতিরিদ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)-কে তাদের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নেন| বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আলোচনা সভায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, তারা “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” হিসেবেই নিজেদের পরিচয়কে ধারণ করেন| শান্তি চুক্তির দাপ্তরিক নথিতেও ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দবন্ধের ব্যবহার এই অবস্থানেরই প্রতিফলন ঘটায়|

 

পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনের একাধিকবারের সংসদ সদস্য এবং সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার জাতীয় সংসদে এই বিষয়ে দৃঢ় বক্তব্য প্রদান করেন| তিনি পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সময়ে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষেরা মূলত “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী”| রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতা এড়াতে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সাথে সংগতি রেখে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটির ব্যবহারই যুক্তিযুক্ত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন|

 

২০০৭-২০০৮ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১/১১ সরকার) সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়| তৎকালীন বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাহাড়িদের পরিচয় নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানামুখী আলোচনা শুরু হলে তিনি পরিষ্কারভাবে জানান যে, তারা “আদিবাসী নন, বরং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী”| আন্তর্জাতিক আইনের (যেমন ILO কনভেনশন ১৬৯) জটিলতা এবং বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তিনি এই অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন|

 

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া শীর্ষ নেতা, প্রথাগত রাজা এবং মূলধারার রাজনীতিবিদদের এই ঐতিহাসিক বক্তব্যগুলো প্রমাণ করে যে, কৌশলগত কিংবা আইনি—উভয় কারণেই তারা বিভিন্ন সময়ে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ পরিচয়টিকে মেনে নিয়েছেন| বর্তমান সময়ে এই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলেও, অতীতের নথিপত্র ও নেতাদের বক্তব্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক অবস্থানের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়|