ঢাকা | জুন ১৯, ২০২৬ - ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

আমার বাবা আমার শক্তি সাহস ও প্রেরণার উৎস

  • আপডেট: Thursday, June 18, 2026 - 9:57 pm

লায়ন মো. গনি মিয়া বাবুল।। বাবা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একজন সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তি নন, তিনি প্রত্যেক সন্তানের জন্যে একজন শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধু, পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ ব্যক্তিত্ব। আমার জীবনেও বাবার অবস্থান ঠিক তেমনই। তিনি আমার শক্তি, সাহস, প্রেরণা এবং জীবনের প্রতিটি ভালো কাজের উৎস।

একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক তার বাবা-মা। ছোটবেলা থেকেই আমি আমার বাবার কাছ থেকে সততা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছি। তিনি কখনো শুধু কথার মাধ্যমে শিক্ষা দেননি, বরং নিজের জীবনাচরণের মাধ্যমে আমাদের সামনে একটি আদর্শ উদাহরণ স্থাপন করেছেন। আমি দেখেছি, তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কখনো কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করেননি। তার এই দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে।

আমার বাবা বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তিনি সবসময় আমাদের পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব দিতে উৎসাহিত করতেন। জীবনের নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা করেননি। অনেক সময় নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে তিনি আমাদের প্রয়োজন পূরণ করেছেন। তার এই আত্মত্যাগ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আমি উপলব্ধি করি যে, একজন বাবা তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন।

বাবার কাছ থেকে আমি শিখেছি সময়ের মূল্য। তিনি সব কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন এবং অন্যদেরও সময়ের গুরুত্ব বোঝাতেন। তিনি বলতেন, সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। তার এই শিক্ষা আমার ব্যক্তিগত ও শিক্ষাজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আমি এখন প্রতিটি কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন করার চেষ্টা করি এবং সময় নষ্ট না করার গুরুত্ব উপলব্ধি করি।

আমার বাবা মোঃ ইসমাইল হোসেন। তিনি শুধু আমার জন্মদাতা নন, আদর্শেরও প্রতীক। তিনি আমার প্রেরণা। ২০১৪ সালের ১২ আগষ্ট আমার বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে আমার দাদার নামে প্রতিষ্ঠিত কাছম আলী ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল মাঠে ঐদিন বিকালে তাঁর নামাজে জানাযা শেষে টেপিরবাড়ি গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। তখন আকাশ থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি নামছিল। মনে হয় বাবার শোকে বুঝি আকাশও কাঁদছিল। জানাযার নামাজে বিভিন্ন শ্রেণী- পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ প্রায় ৭ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লী উপস্থিত ছিলেন। ২০১৪ সালের ১৬ আগষ্ট কাছম আলী ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল মাঠে তাঁর কুলখানি অনুষ্ঠানেও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

আমার বাবা ছিলেন নির্লোভ, নির্মোহ, নিরংহকার ও পরোপকারী। জীবনভর দিয়েছেন সবসময় উজাড় করে, নেননি কিছুই। হৃদয় দিয়েই ভালবাসতেন সুহৃদসহ ছোট-বড় সকলকেই। যে ভালবাসা ছিল নিখাদ, নির্ভেজাল, তার মধ্যে কোনদিন রাগ, ক্ষোভ, জেদ, বিরক্তি, অসহিষ্ণুতা, মুখভার- এগুলোর একটিও ছিল না। তার কথায় কেউ আহত হয়েছেন এমন নজির নাই। যেকোন কাজে তাঁর কাছে সহযোগিতা চেয়ে পাননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাবা হলেন আমার আদর্শ মানুষ। আমার কাছে আমার বাবা ভাল বুজুর্গ মানুষ বা তিনি ভাল পীর ছিলেন। তিনি আমার শক্তিরও উৎস। আমি আমার বাবাকে কাছ থেকে দেখেছি, নিকট থেকে জেনেছি। বাবার মুখে কখনো খারাপ কথা শুনিনি, বাবা কখনো কাউকে গালি দিতেন না। সিগারেট খেতেন না, দোকানে গিয়ে কখনও আড্ডা দিতেন না। বাবার কোন খারাপ বন্ধু ছিল না। বাবা কখনও খারাপ মানুষের সাথে ওঠাবসা করেননি। বাবা কারো সাথে কোনদিন খারাপ ব্যবহার করতেন না। আমার দৃষ্টিতে আমার বাবা হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। তিনি ছিলেন ভাল অভিভাবক। আমার বাবা তার ভাইদের মধ্যে ছিলেন সবার বড়। তারা বাবাকে সম্মান করতেন, চাচারা আমার বাবাকে দাদা বলে সম্বোধন করতেন। বাবা মেট্টিক পাশ করার পর কিছুদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তারপর তিনি সফলতা ও প্রশংসার সাথে ব্যবসা করেছেন।

জীবনের শেষ অংশে তিনি নিজস্ব জোত-জমিতে কৃষিকাজ দেখাশুনা করতেন এবং আমাদের জমিতে যেসকল কৃষি শ্রমিক কাজ করতো তাদের কাছেও তিনি খুবই প্রিয় মানুষ ছিলেন। আমাদের বাড়িতে বার্ষিক হিসেবে নিয়মিত ৫/৬ জন লোক কাজ করতো তাদের পরিচালনা ও দেখাশোনাও তিনি করতেন। আমাদের গ্রামে সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান। সমাজের প্রধান হিসেবেও মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত আমার বাবা দায়িত্ব পালন করেছেন। আমাদের বাড়ির সামনে জামে মসজিদ, ফোরকানিয়া মাদরাসা, স্কুল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানের জন্য তিনি জমি দান করে গেছেন। তিনি একজন সমাজ সচেতন মানুষ ছিলেন। এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি টেপিরবাড়ি কৃষক সমবায় সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবে তিনি এলাকার কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। এই সমিতির মাধ্যমে এলাকার কৃষকগণ সহজশর্তে টাকা পেত এবং কিস্তির মাধ্যমে কৃষক তার দেনা পরিশোধ করতো। আমার বাবার নেতৃত্বে এই কৃষক সমবায় সমিতির মাধ্যমে সঞ্চয় সংগ্রহ করে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন মোতাবেক কৃষকদের মধ্যে কৃষি সামগ্রী বিতরণ করা হতো। এতে অনেক দরিদ্র কৃষকও স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি নিজের ও এলাকার মানুষের জমিতে সেচের জন্য ১৯৮০ সালে নিজস্ব জমিতে গভীর নলকূপ স্থাপন করেছিলেন। এই গভীর নলকূপ স্থাপনে ঐ সময় খরচ হয় প্রায় ১ লক্ষ টাকা। যার সিংহভাগ তিনি নিজেই প্রদান করেছেন। তিনি একজন স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ছিলেন। বিশুদ্ধ খাবার পানির চাহিদা মেটাতে তিনি ১৯৭৮ সালে আমাদের বাড়ীতে টিউবওয়েল স্থাপন করেছিলেন, এতে নিজের পরিবারের সদস্য ছাড়াও গ্রামের লোকজনদের পানীয়জলের সুব্যবস্থা হয়। তিনি সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসতেন। তিনি একজন বৃক্ষ প্রেমিক মানুষ ছিলেন, প্রতি বছর বর্ষাকালে তিনি ফলজ, বনজ ও ভেষজ বৃক্ষের চারা রোপণ করতেন। রোপিত বৃক্ষের সংরক্ষণ ও পরিচর্যার বিষয়েও তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে তিনি আমাদের বাড়ীর চারপাশকে সবুজে শ্যামলে মনোরম পরিবেশে সাজিয়ে গেছেন। এলাকার অনেক দরিদ্র মানুষের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ তিনি গোপনে বা প্রকাশ্যে দিয়েছেন। ধর্মীয় শিক্ষা অর্থাৎ মাদ্রাসা ছাত্রদেরও তিনি আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন। এলাকার অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য তিনি সর্বদা কাজ করে গেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রচার বিমুখ। তিনি দান করতে কৃপণ ছিলেন না। কিন্তু নিজ নাম প্রচারে তিনি বড়ই কৃপণ ছিলেন। আমার বাবা একজন ধৈর্য্যশীল মানুষ ছিলেন। তিনি কখনো হা-হুতাশ করতেন না। তিনি একমাত্র আল্লাহর সাহায্য চাইতেন। তিনি খুবই খোদাভীরু ও পরহেযগার মানুষ ছিলেন। তিনি ৫ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামায়াতের সাথে পড়তেন। আমার বাবা মৃত্যুবরণ করার পর ২০১৫ সালে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ইসমাইল হোসেন ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অসহায় মানুষদের সহায়তা করাসহ নানা ধরণের জনহিতকর কাজ করা হচ্ছে। ইসমাইল হোসেন ফাউন্ডেশন বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, দুস্থদের মধ্যে ঈদ উপহার প্রদান, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ প্রভৃতি প্রশংসনীয় কাজ করে আসছে। স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে শ্রীপুর উপজেলার শিশুপল্লী সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার নাম করা হয় ‘ইসমাইল হোসেন মোড়’। এই মোড়কে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, স্কুলসহ নানা ধরণের সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠেছে।
৯২ বছর বয়সেও আমার বাবার দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি স্বাভাবিক ছিল। তিনি ধর্মীয় বইপত্র স্বাভাবিকভাবে পড়তেন। মসজিদে তালিমে তিনি কিতাব পড়তেন। দীর্ঘদিন তিনি আমাদের বাড়ির মসজিদে আযান দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি মোয়াজ্জিনের কাজও করেছেন। আমি দেখেছি আমার বাবা সর্বদা আল্লাহ তায়ালার জিকির করতেন। অসুস্থ্য অবস্থাতেও তিনি তাইয়্যুম করে নামাজ পড়েছেন এবং সারাক্ষণ আল্লাহ তায়ালার জিকিরে মশগুল ছিলেন। আমাদের কাছে তাঁর একমাত্র চাওয়া ছিল আমরা যেন মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন ভাল মানুষ হই। আমার বাবা আর কখনো ফিরে আসবেন না। আসা সম্ভবও নয়। কিন্তু আমার বাবার একমাত্র চাওয়া আমরা যেন ভাল মানুষ হতে পারি। সকলের কাছে দোয়া চাই আমরা যেন ভাল মানুষ হিসেবে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে পারি। অসহায় মানুষের সহায়তায় যেন আমরা কাজ করে যেতে পারি।
বাবা সম্পর্কে যতই লেখা হোক না কেন, তার অবদান ভাষায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তার জীবনসংগ্রাম, আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা এবং মানবিক গুণাবলি আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে বাবার অবদান রয়েছে। তাই গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আমার বাবা আমার শক্তি, সাহস ও প্রেরণা।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমার বাবাকে যেন জান্নাতুল ফেরদৌস বেহেশত দান করেন, আমীন।

লেখক পরিচিতি-
লায়ন মো. গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
চেয়ারম্যান, ইসমাইল হোসেন ফাউন্ডেশন
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি