ঢাকা | জুন ৬, ২০২৬ - ৩:৫০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

সুন্দরবন ও সুনীল অর্থনীতি: বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

  • আপডেট: Saturday, June 6, 2026 - 1:12 pm

মো. মামুন হাসান।। বাংলাদেশে উন্নয়ন আলোচনায় আমরা দীর্ঘদিন ধরে সবুজ অর্থনীতি, ডিজিটাল অর্থনীতি কিংবা শিল্প অর্থনীতির কথা বলেছি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর নতুন বাস্তবতায় বিশ্বের নজর ক্রমশ ঝুঁকছে সুনীল অর্থনীতির দিকে। সমুদ্র, উপকূল, নদী ও জলজ সম্পদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক দর্শন শুধু আয় বৃদ্ধির পথ নয়, বরং জলবায়ু অভিযোজন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই পর্যটনেরও শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের জন্য এই সুনীল অর্থনীতির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো সুন্দরবন।

সুন্দরবনকে আমরা সাধারণত একটি বন, একটি বিশ্ব ঐতিহ্য কিংবা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে দেখি। কিন্তু ভবিষ্যতের অর্থনীতির ভাষায় সুন্দরবন একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক অবকাঠামো, একটি কার্বন ব্যাংক এবং একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সম্পদ। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে সুন্দরবন শুধু উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে না, এটি বিপুল পরিমাণ কার্বন ধারণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে এই বন মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার প্রধান ভিত্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুন্দরবনের এই পরিবেশগত শক্তিকে কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে “ব্লু ট্যুরিজম” বা সুনীল পর্যটনের ধারণায়।

বাংলাদেশে পর্যটনকে এখনও অনেকাংশে দর্শনভিত্তিক কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। পর্যটক আসে, ছবি তোলে, ঘুরে যায়। অথচ আধুনিক বিশ্বে পর্যটন শুধু ভ্রমণ নয়; এটি গবেষণা, শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, কার্বন অর্থনীতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যদি জলবায়ু পর্যটন, গবেষণা পর্যটন, জীববৈচিত্র্য পর্যটন এবং কমিউনিটি ভিত্তিক ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী পর্যটকের একটি বড় অংশ এখন এমন গন্তব্য খুঁজছে যেখানে প্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থানীয় সংস্কৃতির বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। সুন্দরবন সেই সুযোগের এক অনন্য উদাহরণ। এখানে একজন পর্যটক শুধু বাঘ দেখার জন্য আসবে না; সে জানতে চাইবে কীভাবে একটি বন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করছে, কীভাবে ম্যানগ্রোভ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে এবং কীভাবে স্থানীয় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুন্দরবনের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু টিকিট বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে সুন্দরবনের পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক ও জীবিকাভিত্তিক সেবার অর্থনৈতিক মূল্য বিপুল। পর্যটন খাত একাই জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে যদি অবকাঠামো, তথ্যসেবা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়।

তবে এখানে একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। সুন্দরবনকে আর শুধু সংরক্ষিত বন হিসেবে দেখলে চলবে না; একে “জলবায়ু বিশ্ববিদ্যালয়” হিসেবে ভাবতে হবে। যেখানে দেশি বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক, পরিবেশবিদ এবং পর্যটক এসে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। পৃথিবীর বহু দেশ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে গবেষণা ও শিক্ষা পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবনও সেই সম্ভাবনা ধারণ করে।

একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের মূল অংশীদার করতে হবে। মৌয়াল, জেলে, বনজীবী এবং উপকূলীয় নারীদের সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন মডেল গড়ে উঠলে পর্যটনের আয় সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে। এতে বন রক্ষার সামাজিক প্রণোদনাও বৃদ্ধি পাবে। কারণ মানুষ তখন বুঝবে, জীবন্ত বনই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

তবে উন্নয়নের নামে পর্যটনের অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ যেন সুন্দরবনের জন্য নতুন হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং পরিবেশগত চাপ ইতোমধ্যে সুন্দরবনের স্থিতিস্থাপকতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। তাই পর্যটন উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতি কেন্দ্রিক, সীমিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক।

আজকের পৃথিবীতে যে দেশ প্রকৃতিকে অর্থনীতির অংশ বানাতে পারবে, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তার হাতেই থাকবে। বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবন সেই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে। সুনীল অর্থনীতি কেবল সমুদ্র বা নদীর অর্থনীতি নয়; এটি মানুষ, প্রকৃতি এবং উন্নয়নের মধ্যে নতুন সামাজিক চুক্তি।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল যেন আমাদের নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে। যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু কংক্রিটের স্থাপনা নয়, বরং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং প্রজন্মান্তরের জন্য টেকসই সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতিমালার মাধ্যমে সুন্দরবন একদিন বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির রাজধানীতে পরিণত হতে পারে। তখন পর্যটন হবে শুধু বিনোদনের শিল্প নয়, বরং জলবায়ু সচেতন উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

লেখক- মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।