ঢাকা | মার্চ ১২, ২০২৬ - ১:৫২ অপরাহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি

  • আপডেট: Thursday, March 12, 2026 - 10:50 am

মো. মামুন হাসান।। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো সংকটই এখন আর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায়। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত আজ এমন এক চরম সীমায় পৌঁছেছে যে, একে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি হিসেবে বিবেচনা করার আর কোনো অবকাশ নেই; বরং এটি এখন এক বিশ্বজনীন সংকটে রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘নির্ভরতা তত্ত্ব’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যেখানে প্রান্তিক ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে অনিবার্যভাবেই শক্তিধর কেন্দ্রগুলোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তার অভিঘাত কেবল ওই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এর উত্তপ্ত ঢেউ সরাসরি এসে আঘাত করবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং উদীয়মান পর্যটন শিল্পে। এই ভূরাজনৈতিক মহাপ্রলয়ের আঁচ থেকে বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কোনোভাবেই মুক্ত নয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ -২৬ অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫৮ থেকে ৬০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় সৌদি আরবে প্রায় ২৬ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪ লাখের বেশি, ওমানে প্রায় ৭ লাখ, কাতারে প্রায় ৪ লাখ, কুয়েতে প্রায় ৩ লাখ এবং বাহরাইনে প্রায় ২ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যার মধ্যে আনুমানিক ৬০ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। একক দেশ হিসেবে সৌদি আরব থেকেই বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান ভিত্তি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে স্থিতিশীলতা ফিরছিল তা আবারও মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে এবং সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সংকুচিত করবে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি বাণিজ্যের ওপর। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক সার এবং ভোজ্য তেলের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও তৎসংলগ্ন রুট দিয়ে আমদানি করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে বাংলাদেশের আমদানিকৃত রাসায়নিক সারের প্রায় ৫০ শতাংশের উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো অবরুদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে জাহাজ ভাড়া এবং বীমা খরচ এক লাফে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে আমদানিকৃত পণ্যের খরচ বেড়ে গিয়ে দেশে অসহনীয় মূল্যস্ফীতি তৈরি হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নেও বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ আমাদের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশের বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জ্বালানি আমদানি করে। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায় তবে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় হঠাৎ করেই কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়ে যেতে পারে যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচে।

 

ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যকার ত্রিভুজ সংঘাত যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, বরং এক ভয়াবহ সাপ্লাই চেইন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ২০২৬ সালের মার্চ মাসের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার ঘোষণায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের এই রুট দিয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং বিপরীতে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে এবং হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ মেয়াদে অবরুদ্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে করে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা আমাদের রপ্তানি পণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে ছিটকে দেবে।

লোহিত সাগরের পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল যুদ্ধকবলিত হলে লজিস্টিকস খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। জাহাজগুলোকে কেপ অফ গুড হোপ হয়ে ঘুরে আসতে হওয়ায় যাতায়াত দূরত্ব ৩,৫০০ মাইল বাড়ার পাশাপাশি কন্টেইনার প্রতি ভাড়া ইতিমধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে এই ভাড়া ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর সাথে যুদ্ধকালীন বীমা প্রিমিয়াম বা ওয়ার রিস্ক সারচার্জ কয়েক গুণ বেড়ে গিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির নিট মুনাফা মার্জিন ২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে পারে। এছাড়া দুবাই ও কাতারের মতো প্রধান বিমান ট্রানজিট পয়েন্টগুলো বন্ধ হলে এয়ার ফ্রেইট চার্জ অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে, যার ফলে সবজি ও ফলমূলের মতো পচনশীল পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ প্রতি মাসে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলারের বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার যেখানে একক দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ৪১২ মিলিয়ন ডলার এবং সৌদি আরবে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থায় এই প্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।আন্তর্জাতিক শিপিং রুট পরিবর্তনের ফলে জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য যেমন কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সরবরাহে জটিলতা দেখা দেওয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও হোম টেক্সটাইল রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া জর্ডান ও লেবাননের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে রপ্তানি আদেশ প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে যা সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই অস্থিতিশীলতা কেবল পণ্যের চাহিদাই কমায়নি বরং বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে বাড়তি ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের লিড টাইম বেড়ে যাচ্ছে যা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইরানের বাজারে প্রায় ১০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার বেশিরভাগই তৈরি পোশাক ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য। ইরানের রপ্তানি বাজার হারানোর জোর সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপের বাজারেও এই যুদ্ধের অভিঘাত হবে সুদূরপ্রসারী, কারণ বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে এই অঞ্চল থেকে। যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপে মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ১০ শতাংশে পৌঁছালে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, যার প্রতিফলন ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসের তথ্যমতে, ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ৮.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং জার্মানির মতো বড় বাজারে এই ধস ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শিপিং বিলম্বের কারণে লিড টাইম ১২ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় ক্রেতারা ইতিমধ্যে তাদের ১০ শতাংশ অর্ডার ভিয়েতনাম বা তুরস্কের মতো বিকল্প দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সামগ্রিকভাবে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকা যুদ্ধ বাংলাদেশের ভঙ্গুর রপ্তানি খাতকে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং নজিরবিহীন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পর্যটন ও যোগাযোগ খাতের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব হবে বহুমুখী। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে ভয়াবহ ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ অনিরাপদ হওয়ায় বিদেশি পর্যটক আগমন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন বলছে, এর ফলে বছর শেষে রাজস্ব আয় প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন টাকা হ্রাস পাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। যুদ্ধের কারণে ট্রানজিট হাবগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফ্লাইট বাতিলের হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং বিমান টিকিটের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে কক্সবাজার ও সিলেটের বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের বুকিং গত বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত ধসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ভ্রমণ বীমার প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি গবেষকদের সংখ্যা ১৮ শতাংশের বেশি কমে যেতে পারে।

 

বাংলাদেশকে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি দূরদর্শী ও বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। শ্রমবাজারের অতিরিক্ত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা হ্রাস করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলোতে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী অভিবাসন কূটনীতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। জ্বালানি ও আমদানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিকল্প উৎসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে অন্তত ৯০ দিনের কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে বর্তমানে আমাদের সক্ষমতা মাত্র ৩৫ দিনের সমপরিমাণ। একইসঙ্গে দেশের খনিজ সম্পদ আহরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বঙ্গোপসাগরের তলদেশসহ অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করতে হবে। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদে বাধ্যতামূলকভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করে স্থানীয় বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমুদ্রপথে সরাসরি জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় একটি কার্যকর ‘জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ ও ‘জাতীয় প্রবাসী জরুরি তহবিল’ গঠন করা প্রয়োজন, যাতে যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দ্রুত প্রত্যাবাসন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তবে এই সংকটের সময় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ বিপদ হয়ে দাঁড়ায় অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং গুজব নির্ভর বাজার পরিস্থিতি। প্রায়শই দেখা যায় আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার আগেই বা যুদ্ধের প্রকৃত প্রভাব শুরু হওয়ার আগেই এক শ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু চক্র যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার জন্য এরা যুদ্ধের খবরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। গুজব ছড়ানো হয় যে জ্বালানি তেল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে যার ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে পণ্য কেনার প্রবণতা দেখা দেয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু সিন্ডিকেটগুলো গুদামজাতকরণ বা মজুদদারির মাধ্যমে পণ্যের দাম রাতারাতি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাকে পুঁজি করে কেউ যেন এমন হীন ফায়দা লুটতে না পারে সেদিকে সরকারের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে কেবল আমদানির ওপর নির্ভর না করে কঠোর বাজার তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যাতে কোনো অসাধু চক্র যুদ্ধের দোহাই দিয়ে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের মজুদের সঠিক তথ্য নিয়মিত সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত যাতে গুজবের ডালপালা না ছড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই কেবল বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সক্রিয় কূটনীতি, অসাধু সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর বাজার মনিটরিং এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

 

লেখক: মো: মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) এবং বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।