একটি দল সকাল-বিকাল মিথ্যা কথা বলে: তারেক রহমান
যশোর প্রতিনিধি।। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর আমিরের অ্যাকাউন্ট থেকে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য প্রচার প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আপনারা জাতির সামনে বলছেন আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন আপনাদের হ্যাক-ম্যাক কিচ্ছু হয় নাই। বাচাঁর জন্য আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন। যারা নির্বাচনের আগে জনগণের সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারেন তারা নির্বাচনের পরে কী পরিমাণ মিথ্যা কথা বলতে পারে এটি আমাদের সহজেই বোধগম্য।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, একটি দল সকাল-বিকাল মিথ্যা কথা বলে। এদের কারণে একাত্তরে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। ফলে তাদেরকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।
সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে যশোর সদর উপজেলার উপশহর কলেজ মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তারেক রহমান একথা বলেন।
তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী এদেশের নারীদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়। সে কারণে দলটির সবথেকে বড় নেতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন।
আবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে লক্ষ-কোটি কর্মজীবী মা-বোনদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছেন। এখন তারাই আবার নিজেদের নারী কর্মীদেরকে গ্রামে গ্রামে মা-বোনেদের কাছে পাঠাচ্ছে তাদের এনআইডি নাম্বার আর বিকাশ নাম্বার নেওয়ার জন্য।
এরা হয়তো কাউকে কিছু টাকা বিকাশ করেও দেবে। কিন্তু, এরপর আর তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের (জামায়াতের) নারী কর্মীরাওতো ঘর থেকে বের হয়ে তাদের দলের কাজে যায়। তাহলে আমরা কি এখন প্রশ্ন করতে পারি না তাদের নারী কর্মীদের কাছে যে, আপনাদের দলের নেতা দেখুন আপনাদের সম্পর্কে কী নোংড়া চিন্তা করেন।
তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় নবী নবী করিম (স.) এর স্ত্রী বিবি খাদিজা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী নারী।
বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের যে বাহিনী ছিল তাদের লোক লস্কর, যত রকম সরঞ্জাম ছিল যুদ্ধের খাবার-দাবার সকল কিছুর আয়োজন করেছিল হযরত খাদিজা (রা.) তার অবস্থান থেকে।
শুধু তাই নয় বদরের যুদ্ধে যে সকল মুসলমান সৈনিকেরা আহত হয়েছিল তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও হযরত আয়েশার মাধ্যমে করা হয়েছিল সেদিন। যে নার্সিং সিস্টেম এখন আমরা দেখি সেই নার্সিং সিস্টেম সেই সময় হযরত আয়েশার নেতৃত্বেই হয়েছিল।
আমরা গতকাল দেখেছি এই রাজনৈতিক দলটির (জামায়াতে ইসলাম) এই নেতাটি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি কর্মজীবী নারী, কর্মজীবী মা, কর্মজীবী মেয়ে সন্তান সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর একটি কথা বলেছেন।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা নিজেদের দেশের মানুষকে এইভাবে আপত্তিকর বিশ্লেষণে বিশ্লেষণ করে তাদের কাছ থেকে জনগণ ভালো কিছু আশা করতে পারে? তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব নয়।
শুধু তাই নয়, এই আপত্তিকর কথা বলার পরে যখন তারা দেখলো বাংলাদেশের সকল মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে, তখন তারা বললো তাদের অ্যাকাউন্ট নাকি হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এইটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। কারণ, সেই বক্তব্য দেওয়ার পরে তারা আরো অনেক বক্তব্য দিয়েছে। অর্থাৎ তারা জাতির সামনে জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা বলেছে।
তারেক রহমান বলেন, যারা জনজণের সামনে প্রকাশ্যে মিথ্যা কথা বলতে পারেন তারা আর যাই হোক জনগণের বন্ধু হতে পারেনা। তাদের দলেওতো নারী কর্মী আছে বলে শুনেছি।
তিনি বলেন, বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে, দেশের যদি উন্নয়ন করতে হয়, দেশকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ রাখলে চলবে না। আজকে যে গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানুষ গর্ব করে সেই শিল্প বাংলাদেশের নারীরা চালাচ্ছেন। এই শিল্পে অন্তত ৫০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের প্রতিদিনকার কষ্টের ফলে আজ সারা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প একটা বিখ্যাত শিল্পে পরিণত হয়েছে।
সেজন্যই এই নারী সমাজকে শুধু সহযোগিতা না, তাদেরকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারে থাকাকালে বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছিল। আজ দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার দল হিসেবে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি আমরা আপনাদের সমর্থনে ১২ তারিখের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারলে বিএনপি সকল মায়েদের কাছে, সকল গৃহিনীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেবো। যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ফ্যামিলির ন্যুনতম একজন মা বা গৃহিনী সরকারের কাছ থেকে একটা সুযোগ পাবেন।
তারেক রহমান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি পুরুষের পাশাপাশি নারীরা যদি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারে তাহলেই একমাত্র আমাদের এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। অন্যথায় কোনোভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পেছনে রেখে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারবে এটা আমরা আশা করতে পারি না। বাংলাদেশ তখনই উন্নতি করতে পারবে যখন নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করতে পারবো।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আজকে দেখতে পাচ্ছি বিগত স্বৈরাচারের সময় যেভাবে এদেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যেভাবে আমি-ডামি নির্বাচন করা হয়েছিল। যেভাবে নিশিরাতের নির্বাচন করা হয়েছিল-ওই যে দলটির কথা বললাম (জামায়াতে ইসলামী) যারা নিজের দেশের সন্তানদেরকে, নিজের দেশের নারীদেরকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চাই এরা এখন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে কীভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। এরা এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি নাম্বার নেওয়ার জন্য, বিকাশ নাম্বার নেওয়ার জন্য।
এ প্রসঙ্গে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, এই খবর আছে আপনাদের কাছে? জবাবে জনতা বলেন, আছে।
তারেক রহমান জামায়াতকে উল্লেখ করে এই প্রসঙ্গে আরো বলেন, ‘তারা বলেন, তারা সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন। আরে ভাই আপনাদের এই প্রস্তাবটাইতো সবথেকে বড় অসৎ প্রস্তাব। আপনারা অসৎ কাজ শুরু করে কীভাবে মনে করেন যে, সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন?’
তিনি বলেন, আজকে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য, বাধাগ্রস্ত করার জন্য এরা উঠেপড়ে লেগেছে। সেজন্য আপনাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে আপনার সেই ভোটের অধিকারকে কেড়ে নিতে না পারে।
তিনি বলেন, নতুন গল্প শুনছি ইদানিং। এবার নাকি ভোট গণনা করতে অনেক সময় লাগবে। এদেশের মানুষ হয়তো এক যুগ ভোট দিতে পারেনি, কিন্তু ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের একেবারে যে নাই তা না। এদেশের মানুষ একানব্বই সালে ভোট দিয়েছে, ছিয়ানব্বই সালে ভোট দিয়েছে, ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গণনা করতে কেনম সময় লাগে বাংলাদেশের মানুষের সেই ধারণা আছে। কাজেই যদি কেউ ভোট গণনা করতে দেরি হবে উছিলাতে সুযোগ নিতে চাই তাহলে আপনাদেরকে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
জনসভায় তারেক রহমান ঘোষণা করেন, জনতার রায়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারলে সকল কৃষকের দশ হাজার টাকার কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। একইসাথে কৃষকদেরকে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হবে এবং স্বল্পসুদে কৃষিঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
যুবক-যুবতীদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য আইটি পাক স্থাপর্নসহ একাধিক বিকল্প গড়ে তোলা হবে। আখ চাষ বৃদ্ধি ও বন্ধ চিনিকল খুলে দেওয়া হবে। যশোরের ফুল যাতে বিদেশে রপ্তানি হতে পারে তার জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদার করা হবে।
তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উলাশী খাল খনন কর্মসূচির উল্লেখ করে বলেন, বিএনটি আবার ক্ষমতায় যেতে পারলে উলাশী খাল পুনরায় খননসহ দেশে হাজার হাজার খাল খনন করে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে। জিয়াউর রহমানের আমলে চালু হওয়া জিকে প্রকল্প আবার সচল করারও প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
বিএনপি চেয়ারম্যান ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ সকল ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের জন্য সম্মানি ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারলে এই ভাতা প্রদান করা হবে, যাতে সকল ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিরা সম্মানের সাথেই জীবন অতিবাহিত করতে পারেন।
তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক মানুষের অংশগ্রহণের উল্লেখ করে বলেন, এই দেশে যেমন মুসলমানের, তেমনি হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষের। আমরা সকল ধর্মের মানুষই একতাবদ্ধ হয়ে একাত্তরে দেশ স্বাধীন করেছি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আবার সবাই একতাবদ্ধ হয়েই কাঙ্খিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
জনসভার শেষাংশে তারেক রহমান যশোরের ছয়টি আসনসহ বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার (সাত জেলা) ২২টি আসনে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থীদের দাঁড় করিয়ে জনতার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, আজকে যারা ধানের শীষ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাদেরকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। তারা যাতে সংসদে যেতে পারে সেজন্য আপনাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখতে হবে এবং ভোট দিতে হবে। নির্বাচিত হতে পারলে এসব নেতা ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের দায়িত্ব নেবেন। আপনার এলাকা ও দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন।
তারেক রহমান সোমবার খুলনার জনসভা শেষে হেলিকপ্টারে করে যশোর বিরামপুর স্কুল মাঠের হেলিপ্যাডে নামে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে। সেখান থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা গাড়িতে চড়ে উপশহর কলেজ মাঠের জনসভামঞ্চে পৌঁছান ২টা ৩০ মিনিটে। তিনি বক্তব্য শুরু করেন দুপুর ২টা ৩৯ মিনিটে। তিনি ৩৩ মিনিট বক্তব্য রাখেন যশোরের জনসভায়।
জনসভামঞ্চ থেকে নেমে তারেক রহমান জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শহীদ কয়েকজনের পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
যশোর জেলা বিএনপি সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনের সঞ্চালনায় জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন তারেক রহমানের উপদেষ্টা সৈয়দ আহমেদ রুমী, কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, কুষ্টিয়ার জাকির হোসেন সরদার, নড়াইলের বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মেহেরপুরের জাভেদ মাসুদ মিল্টন এবং যশোরের মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু।











