ঢাকা | মে ১৩, ২০২৬ - ৭:৪৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

আনোয়ারার এসিল্যান্ড বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য কারণে বহাল তবিয়তে, ভূমি সেবায় চরম ভোগান্তি

  • আপডেট: Wednesday, May 13, 2026 - 7:19 pm

 

আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা ::

 

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দুর্নীতির শীর্ষে ভূমি অফিসগুলোতে সেবার নামে চলছে চরম হয়রানি। বাড়তি টাকা ছাড়া হয় না কোনো কাজ। প্রতি ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয় সেবাপ্রার্থীদের। টাকা ছাড়া নড়ে না ফাইল। ফলে জমির মালিকরা জিম্মি হয়ে সেবা নিচ্ছেন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে।

 

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে বর্তমানে নামজারি কার্যক্রম যেন ‘মিউজিকের’ মতো চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেবাপ্রার্থীদের দাবি, দালাল, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাংবাদিক কিংবা মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া সাধারণ মানুষ এই অফিসে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।

 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বর্তমান এসিল্যান্ড দীপক ত্রিপুরার দায়িত্বকালে ১৯৭৩-৭৪ সালের পুরোনো দলিলের ভিত্তিতেও একাধিক নামজারি সম্পন্ন হয়েছে। এমন চারটি নামজারির খতিয়ানের কপি এ প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে। অথচ সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে আরএস দাগ, কাগজপত্র বা নানা অজুহাত দেখিয়ে নামজারি আবেদন আটকে রাখা হচ্ছে বা খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে। মোটা অঙ্কের ঘুষ দিলেই এই অফিসে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়।

 

অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসের কিছু ক্যাজুয়াল কর্মচারী ১১০০ টাকার সরকারি ডিসিআরের পরিবর্তে ৩১০০ টাকার ডিসিআর কাটতে বাধ্য করছেন। সেই অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে সংশ্লিষ্ট ফাইল এসিল্যান্ডের টেবিলে পৌঁছায় না এবং দিনের পর দিন অনলাইনে ঝুলে থাকে।

 

সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মাত্র ৭০ টাকার আবেদন ফি এবং ১১০০ টাকার ডিসিআর ফি জমা দিয়ে নামজারির খতিয়ান পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে একজন আবেদনকারীকে বিভিন্ন ধাপে ১০ হাজার টাকারও বেশি খরচ করতে হচ্ছে। প্রস্তাব পাঠানো, সার্ভেয়ার, কানুনগো, ডিসিআরসহ নানা অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। ভূমির মালিকানা নিয়ে যত বেশি জটিলতা, ঘুষের টাকার হারও তত বেশি এ অফিসে। কখনো কখনো ২৫-৫০ হাজার টাকাও ছড়ায় ঘুষের রেট। মিস মামলায় মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে।

 

প্রতিদিন এসিল্যান্ড অফিসের সামনে গিজগিজ করছেন সেবাপ্রার্থীরা। নামজারি, ডিসিআর ও মিস মামলার নামে এখানে অবাধে চলে ঘুষ বাণিজ্যের রমরমা ব্যবসা। অফিসের পিয়ন, ক্যাজুয়াল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ-দুর্নীতির অনিয়মকে রূপ দেওয়া হয়েছে নিয়মে। আর এতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

 

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী লোকজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো ফল পাচ্ছে না।

 

ভুক্তভোগী আবদুল আলিম জানান, টাকা না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। আর ঘুষ দিলে একই দিনের ফাইল একই দিনেই প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়।

 

সেবাগ্রহীতা মো. কাদের জানান, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সমস্ত কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও দালাল ছাড়া ফাইল নড়াচড়া করে না। কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

ভুক্তভোগী মিহাদ জানান, কম টাকায় মিউটেশন টু মিউটেশন নামজারি করতে গেলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় স্বয়ং এসিল্যান্ড বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল খারিজ করে দেন।

 

ভুক্তভোগী আবদুল হক জানান, ভূমি অফিসে নিজে ফাইল জমা দিতে গেলে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তা ফেরত পাঠানো হয়। অথচ একই ফাইল দালালের মাধ্যমে গেলে কাগজপত্রের কোনো সমস্যা থাকে না। কাজ খুব দ্রুত হয়।

 

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনসুর আলী অভিযোগ করে বলেন, ভূমি অফিসের ভুলে পিতার জায়গায় স্বামীর নাম বসে গেছে। সেই ভুল সংশোধনের জন্য মাসের পর মাস সময় ধরে অফিসে ঘুরছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না। উল্টো আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে।

 

জানা গেছে, বর্তমান এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। গত ১৯ অক্টোবর ভুক্তভোগী মো. আইয়ুব সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরার বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

 

তবে কিছু ভূমির দালাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসিল্যান্ডের পক্ষ নিয়ে মন্তব্য করছেন এবং ১১০০ টাকায় ডিসিআর কাটা হচ্ছে বলে প্রচার চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

 

ভুক্তভোগীরা জানান, বর্তমান এসিল্যান্ডের কার্যক্রম নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে সেবাগ্রহীতাদের উপস্থিতিতে একটি গণশুনানি আয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে বিভাগীয় কমিশনার ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।

 

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সিনিয়র সহকারী সচিব মো. উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরাকে বরিশাল বিভাগে বদলি করা হয়। তবে রহস্যজনক কারণে পরদিন ১৩ জানুয়ারি সেই বদলির প্রজ্ঞাপন স্থগিত করে তাকে পুনরায় আনোয়ারায় বহাল রাখা হয় বলে জানা গেছে।

 

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।