বাবা খুন-দাদা নিখোঁজ, মায়ের অনুপ্রেরণায় বিশ্বকাপে এসে ইতিহাস গড়লেন হুসেন
স্পোর্টস ডেস্ক।। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নরওয়ের বিরুদ্ধে ৪-১ ব্যবধানে হেরে গেলেও, ইরাকের ফুটবল ইতিহাসে এক আবেগঘন ও স্মরণীয় অধ্যায়ের রচনা করলেন দলের তারকা স্ট্রাইকার আইমেন হুসেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে খেলতে আসা ইরাকের হয়ে বিশ্বমঞ্চে দেশের ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় গোলটি করার গৌরব অর্জন করেন এই ৩০ বছর বয়সী ফরওয়ার্ড। তবে এই ঐতিহাসিক গোলের পেছনের গল্পটি কেবল ফুটবলীয় দক্ষতার নয়, বরং যুদ্ধ, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আর চরম অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে এক যুবকের অবিস্মরণীয় লড়াইয়ের কাহিনী।
উত্তর-মধ্য ইরাকের আল-হাউইজা জেলার আল-সাফরা গ্রামে ১৯৯৬ সালে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া হুসেনের শৈশব কেটেছে যুদ্ধের কালো ছায়ায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে ২০০৮ সালে তাঁর বাবা, যিনি ইরাকি সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক ছিলেন, আল-কায়েদার সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। এর কয়েক বছর পর তাঁর দাদাকে অপহরণ করা হয়, যিনি আজ পর্যন্ত নিখোঁজ। এই চরম পারিবারিক সংকটে হুসেইন ফুটবল খেলা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও, তাঁর মায়ের অনুপ্রেরণা ও তাঁর ইচ্ছে শক্তির উপর ভর করে তিনি আবার মাঠে ফেরেন এবং ২০১৩ সালে পেশাদার ফুটবলে আত্মপ্রকাশ করেন।
চলতি বিশ্বকাপে খেলতে আসার পথটাও হুসেইনের জন্য সহজ ছিল না। চলতি মাসের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইমিগ্রেশনে স্কোয়াডের সঙ্গে পৌঁছানোর পর তাঁকে এবং দলের আরেক সদস্যকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যা তাঁর টুর্নামেন্টে খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। সব বাধা পেরিয়ে নরওয়ের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে যখন তিনি মাঠে নামেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। ম্যাচের ২৯ মিনিটে আর্লিং হাল্যান্ডের গোলে নরওয়ে এগিয়ে যাওয়ার ঠিক নয় মিনিট পরেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে আমির আল-আম্মারির এক নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডের সাহায্যে নরওয়ের জাল কাঁপিয়ে ইরাকি সমর্থকদের উল্লাসে ভাসান হুসেইন। যদিও ম্যাচের শেষ দিকে দুর্ভাগ্যবশত তাঁর গায়ে লেগে একটি আত্মঘাতী গোল হয়, তবুও ইরাকের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড তাঁর এই তারকার লড়াকু মানসিকতারই প্রশংসা করেছেন। ইনজুরি কাটিয়ে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থেকে হুসেইন যেভাবে নরওয়ের শক্তিশালী ডিফেন্সকে ব্যস্ত রেখেছিলেন, তা কোচ ও সতীর্থদের গর্বিত করেছে।
ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দনের সময় হুসেইনকে কিছুটা বিষণ্ণ দেখালেও, তাঁর এই গোলটি ইরাকের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অনুপ্রেরণার জন্ম দিয়েছে। দলের ডিফেন্ডার হুসেইন আলিও জানিয়েছেন যে, দলের এই কঠিন সময়ে হুসেইনের গোলটি তাঁদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। আগামী সোমবার ফিলাডেলফিয়ায় শক্তিশালী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে আইমেন হুসেইনের এই লড়াই ও গোল করার আত্মবিশ্বাস ইরাক দলকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।











