ঢাকা | জুন ২৭, ২০২৬ - ৯:৫৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম

প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন আর নেই

  • আপডেট: Saturday, June 27, 2026 - 6:46 pm

মিরসরাই প্রতিনিধি।।

চট্টগ্রামের খ্যাতনামা চক্ষু বিশেষজ্ঞ, সমাজসেবক, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক ম্যানেজিং ট্রাস্টি অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন (৯০) আর নেই।

বার্ধক্যজনিত কারণে শনিবার (২৭ জুন) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মহানগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মিরসরাই উপজেলার বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. আহমেদুর রহমান ও ওয়াহিদুন্নেছা দম্পতির একমাত্র সন্তান অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন ১৯৬১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে চক্ষুবিদ্যায় ডিপ্লোমা (ডিও) এবং এফআরসিএস (অপথালমোলজি) ডিগ্রি লাভ করেন।

দেশে ফিরে ১৯৭২ সালে মাত্র ৩ হাজার ৬০০ টাকা মূলধন নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে চক্ষু চিকিৎসাসেবার এক মানবিক উদ্যোগের সূচনা করেন। ১৯৮৩ সালে পাহাড়তলীতে প্রতিষ্ঠা করেন ১৩০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি), যা বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম আধুনিক চক্ষু চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় চার লাখ রোগীকে চিকিৎসাসেবা, প্রায় ২০ হাজার চক্ষু অস্ত্রোপচার এবং প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি বহির্বিভাগের রোগীকে সেবা দিয়ে আসছে।

চক্ষু চিকিৎসা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি গঠন করেন। তাঁর উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ চক্ষু শিবিরের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ রোগীর চোখের অপারেশন সম্পন্ন হয়। এছাড়া ১৯৭৫ সাল থেকে প্রায় ৮ লাখ স্কুলশিক্ষার্থীর দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, দেশে দক্ষ চক্ষু বিশেষজ্ঞ তৈরিতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজি প্রতিষ্ঠায় তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত ২৬৬ জন চিকিৎসক স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অপটোমেট্রি, মাস্টার্স ইন অপথালমোলজি এবং ডিপ্লোমা ইন কমিউনিটি অপথালমোলজিসহ বিভিন্ন উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অপথালমোলজির জাতীয় কাউন্সিলর ও আঞ্চলিক সচিব, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বিশ্বমানের ৩৫০ শয্যার ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল এবং একটি নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মানবকল্যাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জার্মানির রাষ্ট্রপতির ‘অর্ডার অব মেরিট’, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের ‘লাইফ লং সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’, ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব অপথালমোলজির অ্যাওয়ার্ড, এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অপথালমোলজির ‘ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, অনারারি ডক্টরেটসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।

মৃত্যুকালে তিনি দুই পুত্র, ডা. রাজীব হোসেন ও রিয়াজ হোসেন, নাতি-নাতনি, আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

শনিবার বাদ এশা চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। রোববার সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা এবং একই দিন মিরসরাই উপজেলার কাটাছড়া এলাকায় বাদ জোহর তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের মৃত্যুতে দেশের চিকিৎসা অঙ্গন, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী এবং তাঁর অসংখ্য রোগীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মানবসেবায় নিবেদিত তাঁর কর্মময় জীবন, চিকিৎসাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান এবং দৃষ্টিহীন মানুষের মুখে আলো ফিরিয়ে দেওয়ার নিরলস প্রয়াস দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।