জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈমকে চেকপোস্ট ও থানায় মারধর-হেনস্থা, এসআইসহ তিনজন প্রত্যাহার
ডেস্ক রিপোর্ট।। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসান চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে খুলশী থানা পুলিশ সদস্য পরিচয়ধারীদের হাতে আটক, মারধর ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
শুক্রবার (১২ জুন) রাতে টোল প্লাজা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির হাসান বাদী হয়ে খুলশী থানায় তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন।
এ ঘটনায় তিনজন পুলিশ সদস্যকে খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ক্রিকেটার নাঈম হাসান জানান, রাতে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় টোল প্লাজা এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
তিনি সহযোগিতা করলেও তারা কোনো কথা না শুনে তাকে ধাক্কা দেন এবং সিএনজি অটোরিকশা আটকে রাখেন। সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা পরিচয় দিলেও পুলিশ সদস্যরা তা আমলে না নিয়ে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করে দুর্ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে তাকে গাড়িতে তুলে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পরও তাকে হেনস্তা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘টোলের ওখানে একজন ট্রাফিক পুলিশ আমাদের থামায়। তারপর একজন আমাদের গাড়ি চেক করেছে। আমি ভেবেছিলাম ব্যাগ চেক করবে। তবে এরপর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। কোনো কারণ না জানিয়েই জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এসআই শফিক আমাকে ধাক্কা দিয়ে সিএনজির ভেতর ঢুকিয়ে লক করে দেয়। আমি জিগ্যেস করছিলাম যে কী হয়েছে। আমি তখন ভয় পেয়ে যাই’।
এসআই শফিক আমাকে বলেন, ‘তুই আসামি। তুই চুপ থাক, একটাও কথা বলবি না’। তারপর আমার গলা চেপে ধরে। তখন আমি চিল্লাচিল্লি করেছি ও আব্বুকে কল দিয়েছি। আমার মোবাইলও নিয়ে নেয় তখন। ওখানে থাকা ভাইয়ারা সবাই আমার পরিচয় নিশ্চিত করেছে, তবুও উনি আমার গলা চেপে ধরে রাখে। ওদের একজন পুলিশের ড্রেসে ছিল, আরেকজন পাঞ্জাবি পরা ছিল। ওরা আমাকে থানায় নিয়ে আসে। আমি তখন ওসিকে আমার পরিচয় দিই।
তিনি বলেন, থানায় ওসির সামনেও নাজেহাল করা হয়েছে। ওসি আমাকে বলে, ‘চোখ নামিয়ে কথা বলো’। আমি বলেছি যে- আমি জাতীয় দলের খেলোয়াড়। আমি টেস্ট খেলি। ওখানে প্রায় ১০০ জনের মতো মানুষ ছিলেন, সবাই আমার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। তবুও পুলিশ শোনেনি। তাও ওরা আমার গলা চেপে ধরে থানায় নিয়ে আসে। আমাকে লাঠি দিয়ে মেরেছে এসআই শফিক। আমি বলেছি, আমার গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার আপনার নেই, তবুও মেরেছে।
পরে বিভিন্ন পরিচিতজন ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকে ফোন আসতে শুরু করলে পুলিশ বিষয়টি বুঝতে পারে, এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম বলেন, এসআই শফিক একটি সংস্থার চোরাচালান সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে নাঈম হাসানকে থানায় নিয়ে আসে। তাকে তথ্য দিয়েছিল থানার সেকেন্ড অফিসার। আমাকে না জানিয়েই তারা এই কাজ করেছে।
নাঈমের সঙ্গে থাকা দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীও অভিযোগ করেন, পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশ সদস্যরা তা বিবেচনায় নেয়নি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম জানান, চোরাচালান সংক্রান্ত একটি কার্যক্রমের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান চালায়। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযানে অংশ নেওয়া কিছু কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনের সময় নির্ধারিত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেননি। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) শেষে চট্টগ্রামে ফিরে এ ঘটনার মুখোমুখি হন ক্রিকেটার নাঈম হাসান।
ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পুলিশি হেনস্তা ও হয়রানির ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় ক্রিকেটার চট্টগ্রামের গর্ব নাঈম হাসানের উপর পুলিশি হয়রানির তীব্র নিন্দা জানাই। অবিলম্বে দোষীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি’।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে ঢাকায় রয়েছেন খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম। তিনি এসআই শফিকুল ইসলামকে তথ্য দেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সোনার চোরাচালান আসবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শফিকুল লালখান বাজার এলাকায় অভিযানে যান। মনিরুল একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে চোরাচালানের এই তথ্য পেয়েছেন দাবি করেছেন।
নাঈমকে পুলিশের মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে রাতে থানায় ছুটে যান তাঁর বাবা মাহবুবুল আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিমানবন্দর থেকে নামার পর নাঈমের সঙ্গে আমার কথা হয়। পরে আবার সে জানায় তাকে পুলিশ ধরেছে, মারধর করছে। খবর পেয়ে থানায় এলে ডিউটি অফিসার আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
মধ্যরাতে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে হাজির হন তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরাও। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করেন তাঁরা।
আজ শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।











