ভারী বর্ষণে মিরসরাই প্লাবিত, ত্রাণ নিয়ে মাঠে প্রশাসন
মিরসরাই প্রতিনিধি।।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার কাটাছড়া, দুর্গাপুর, মিঠানালা, হিঙ্গুলী, খৈয়াছড়া, মঘাদিয়া ও ইছাখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক গ্রামের ঘরবাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছে। কোথাও কোথাও ঘরের চুলা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও শিশুখাদ্যের তীব্র সংকট। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ থেকে সহায়তা চেয়েছেন মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার। এদিকে বন্যা পরিস্থিতির কারণে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান গতকাল রাতে নোটিশ দিয়ে এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা স্থগিত করেছেন।
এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্লাবিত এলাকায় সীমিত পরিসরে শুকনো খাবার, খাবার স্যালাইন ও রান্না করা খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইসমাঈল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গ্রামের সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও শ্রমজীবী মানুষ কাজ করতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অন্যদিকে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, শাকসবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মিঠানালা ইউনিয়নের কৃষক আবদুল করিম বলেন, “কয়েক মাসের পরিশ্রম একদিনে শেষ হয়ে গেল। ধান ও সবজি সব পানির নিচে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।”
ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ওয়াহেদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, “প্যারাগন ফিডমিলের কারণে পানি স্বাভাবিকভাবে নামতে পারছে না। ফলে শত শত পরিবার জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে।”
মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম রুবেল বলেন, “কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে এলাকার সড়ক চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে গেছে।”
রিকশাচালক ফকির আহম্মদ বলেন, “তিন দিন ধরে ঠিকমতো আয় নেই। যাত্রীও নেই। পরিবারের খাবার জোগাড় করাই এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে।”
মিঠাছড়া বাজারের ভ্যানচালক আলী মিয়া বলেন, “তিন দিন ঘরে ছিলাম। ঘরে চাল শেষ হয়ে যাওয়ায় বের হয়েছি, কিন্তু বৃষ্টির কারণে কোনো ভাড়া পাচ্ছি না।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, “টানা বর্ষণে আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা কাজ করছেন। পানি কমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হবে।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইসমাঈল বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তারের নির্দেশনায় প্রাথমিকভাবে ৩০০টি শুকনো খাবারের প্যাকেট ও খাবার স্যালাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা খাবারও বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সহায়তা পেলেই দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। এখনো পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেক পরিবার রান্না করে খাবার খাওয়ার অবস্থায় নেই।”
তিনি আরও বলেন, “যেসব এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে খাদ্যসংকটে রয়েছেন, সেখানে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, “বন্যাকবলিত কয়েকটি এলাকা আমি পরিদর্শন করেছি। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পানিবন্দি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হবে।”
মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ এবং কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।”
মিরসরাইয়ের এক ব্যবসায়ী বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে ক্রেতা নেই। ব্যবসা প্রায় বন্ধ। অন্যদিকে কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি চট্টগ্রাম-৩-এর আওতাধীন বন্যাকবলিত অনেক এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। এতে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন বলেন, “বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি তিনি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। দুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে যাতে দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পানি নেমে গেলে কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।”











