ঢাকা | জুন ১৮, ২০২৬ - ১০:০৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বিমান ভ্রমণে যাত্রীদের পরিষেবা

  • আপডেট: Thursday, June 18, 2026 - 7:17 pm

নাসরিন আক্তার নীরা।।

বিমান চলাচল খাতে সাফল্য সাধারণত সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপারেশনাল দক্ষতা এবং আর্থিক লাভজনকতার মতো সূচকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। তবে একজন যাত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। তার কাছে বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শুরু হয় না বিমানে ওঠার পর; বরং বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবনে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়ে যায়।

আমি বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা খাতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি কাছ থেকে দেখেছি, যাত্রীরা শুধুমাত্র আকাশপথে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কোনো এয়ারলাইনের মান নির্ধারণ করেন না। বরং বিমানবন্দরে তাদের প্রাপ্ত সামগ্রিক সেবা, কর্মীদের আচরণ, বিভিন্ন প্রক্রিয়ার গতি ও দক্ষতা, এসবই তাদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

একজন যাত্রীর জন্য দ্রুত ও সুশৃঙ্খল চেক-ইন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সারি, তথ্যের ঘাটতি বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তার ভ্রমণের শুরুতেই বিরূপ অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে লাগেজ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, সময়মতো ও নিরাপদে লাগেজ পৌঁছে দেওয়া, নির্বিঘ্ন বোর্ডিং প্রক্রিয়া এবং সামনের সারির কর্মীদের আন্তরিক ও পেশাদার আচরণ যাত্রীর সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনেকেই মনে করেন, একটি সফল বিমানযাত্রার দায়িত্ব শুধু এয়ারলাইনের। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। একটি নিরবচ্ছিন্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাত্রা নিশ্চিত করতে একাধিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা সংস্থা, ইমিগ্রেশন বিভাগ, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার যেকোনো একটি ধাপে সামান্য বিলম্ব, সমন্বয়হীনতা বা সেবার ঘাটতি পুরো যাত্রা-অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে বিমানবন্দর আর শুধুমাত্র যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়; এটি একটি দেশের ভাবমূর্তি ও আতিথেয়তার প্রতিচ্ছবি। বিদেশি যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরই একটি দেশের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের মাধ্যম। ফলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আধুনিক সুবিধা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদ একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান বিমান চলাচল বাজারে যাত্রীদের প্রত্যাশাও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখনকার যাত্রীরা বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন এবং সেসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশের বিমানবন্দরগুলোর সেবার তুলনা করছেন। ফলে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই হবে না; সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, গ্রাহকসেবার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং মানবসম্পদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে যাত্রীসেবা খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং সহানুভূতিশীল মনোভাব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ অনেক সময় একজন যাত্রী বিমানবন্দরে উদ্বেগ, ক্লান্তি বা সময়ের চাপের মধ্যে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন কর্মীর একটি ইতিবাচক আচরণও যাত্রীর অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি আনন্দদায়ক করে তুলতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ভবিষ্যতের বিমানবন্দরগুলোকে শুধু আধুনিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না; তাদেরকে হতে হবে আরও বেশি যাত্রীকেন্দ্রিক, সহজ, দ্রুত ও কার্যকর সেবাপ্রদানকারী। যে বিমানবন্দর যাত্রীদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে এবং পূরণ করতে পারবে, তারাই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। আর সেই ইতিবাচক অভিজ্ঞতার সূচনা হয় বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বার থেকেই, বিমানে আরোহনের অনেক আগেই।

চলবে…

লেখক: নাসরিন আক্তার নীরা

এভিয়েশন কর্মী