ঢাকা | মে ৩১, ২০২৬ - ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

পাহাড়ে জিয়ার ‘নিরাপত্তা চশমা নীতি’ ও পার্বত্য সংকটের বিবর্তন

  • আপডেট: Saturday, May 30, 2026 - 10:23 pm

 

 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) সবসময়ই একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান আমলের উন্নয়ন বিপর্যয় থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং পরবর্তীতে শান্তি চুক্তি—প্রতিটি অধ্যায়ই পাহাড়ের বর্তমান বাস্তবতাকে রূপ দিয়েছে। এর মধ্যে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নেওয়া সামরিক ও জনসংখ্যাগত নীতিগুলো আজ অবধি তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সমালোচকরা একে ‘জিয়ার নিরাপত্তা চশমা নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ একে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখেন।

 

পার্বত্য সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর চাষযোগ্য জমি (যা পুরো পাহাড়ের প্রায় ৪০% অববাহিকা) পানির নিচে তলিয়ে যায়।

 

প্রায় ১ লাখ মানুষ, বিশেষ করে চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি বাস্তুচ্যুত হয়। পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ যথাযথ না হওয়ায় তাদের একটি বড় অংশ ভারতের অরুণাচল প্রদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাহাড়ের মানুষ আশার আলো দেখেছিল। ১৯৭২ সালের শুরুতে পার্বত্য অঞ্চলের প্রথিতযশা নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) নতুন সরকারের কাছে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, সংবিধানে আলাদা স্বীকৃতি এবং পাহাড়ি জনগণের অধিকার রক্ষার দাবি জানান। কিন্তু তৎকালীন সংবিধানে ‘একক বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ প্রবর্তনের ফলে তাদের দাবি উপেক্ষিত হয়।

 

ক্ষোভে ও প্রতিবাদে ১৯৭২ সালেই এম এন লারমা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ (পিসিজেএসএস) গঠন করেন। এর ঠিক পরপরই, ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি দলটির সামরিক শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘শান্তি বাহিনী’।

 

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর শান্তি বাহিনীর তৎপরতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ও গোয়েন্দা নথিপত্র অনুযায়ী, শান্তি বাহিনী পার্বত্য অঞ্চলকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে সশস্ত্র লড়াই শুরু করে।

 

এই সশস্ত্র আন্দোলনের পেছনে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং আসামের তৎকালীন রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন ছিল বলে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। ওপার থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের জোগান আসায় শান্তি বাহিনী পাহাড়ে সরকারি স্থাপনা, বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অ্যামবুশ ও আক্রমণ জোরদার করে।

 

পাশাপাশি পাহাড়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সাধারণ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তি বাহিনী সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করে, যা ঢাকাকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

 

কাউন্টার-ইন্সারজেন্সি ও পুনর্বাসন

 

১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনারেল জিয়াউর রহমান পাহাড়ের এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে সম্পূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, যা ইতিহাসে তাঁর ‘নিরাপত্তা চশমা নীতি’ (Security Lens Policy) নামে পরিচিত। এই নীতির দুটি মূল স্তম্ভ ছিল:

 

পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর গেরিলা তৎপরতা রুখতে জিয়াউর রহমান বড় আকারের সেনাশিবির স্থাপন করেন। তিন পার্বত্য জেলায় ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে ব্রিগেডের সংখ্যা বাড়ানো হয় এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কাউন্টার-ইন্সারজেন্সি (বিদ্রোহ দমন) অপারেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

 

জিয়া সরকারের সবচেয়ে বিতর্কিত ও দূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত ছিল সমতলের ভূমিহীন ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারগুলোকে পাহাড়ে পুনর্বাসন করা।

 

কৌশলগতভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য কমিয়ে মিশ্র জনসংখ্যা তৈরি করা, যাতে শান্তি বাহিনী স্থানীয়দের কাছ থেকে একতরফা লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সুবিধা না পায়।

 

সরকারি খাস জমিতে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ বাঙালিকে পুনর্বাসিত করা হয়। এর ফলে রাতারাতি পাহাড়ের ডেমোগ্রাফি বা জনসংখ্যার অনুপাতে বড় পরিবর্তন আসে।

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড:

 

কেবল সামরিক শক্তি নয়, পাহাড়ের মানুষদের মন জয় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড।

 

জিয়া আমলের উন্নয়ন ও সমন্বয় মডেল-

 

অর্থায়ন: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ও অন্যান্য দাতা সংস্থা।

বাস্তবায়ন ও সমন্বয়: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

মূল লক্ষ্য: রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

 

সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে দুর্গম পাহাড়ে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন শুরু হয়। তবে সমালোচকদের মতে, এই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্গম অঞ্চলে সেনাবাহিনীর যাতায়াত সহজ করা এবং পুনর্বাসিত বাঙালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

জিয়াউর রহমানের এই দ্বিমুখী (সামরিক ও উন্নয়ন) নীতির পক্ষে ও বিপক্ষে আজও তীব্র যুক্তি-তর্ক রয়েছে।

 

দৃষ্টিভঙ্গি/সমালোচনা

 

রাষ্ট্রীয় ও সামরিক যুক্তি:

 

ভূমি বিরোধ ও জাতিগত দাঙ্গা:

সমতলের বাঙালিদের পাহাড়ে বসতি স্থাপনের ফলে স্থানীয় জুমচাষীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার লঙ্ঘিত হয়। এটি পাহাড়ের জাতিগত সহিংসতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

সার্বভৌমত্ব রক্ষা:

বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রুখতে এবং দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য তৈরি করাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ মনে করা হতো।

 

মানবাধিকার লঙ্ঘন:

ব্যাপক সামরিকায়নের ফলে সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে পড়ে এবং বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।

 

উন্নয়ন ও মূলধারার অন্তর্ভুক্তি:

শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা এবং সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে পাহাড়কে দেশের মূল অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই আমলেই।

 

শান্তি চুক্তি ও বর্তমান বাস্তবতা

 

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর পাহাড়ে সংঘাত আরও রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। আশির দশকজুড়ে দুই পক্ষই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অবশেষে সুদীর্ঘ দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের পর, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

 

অনেকে মনে করেন, জিয়াউর রহমান যে সামরিক চাপ ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য তৈরি করেছিলেন, তা পিসিজেএসএসকে বুঝতে বাধ্য করেছিল যে সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়। ফলশ্রুতিতে তারা আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়, যা এই চুক্তির পথ সুগম করে।

 

শান্তি চুক্তির পর প্রায় তিন দশক পার হতে চললেও পাহাড় এখনও পুরোপুরি শান্ত নয়।

 

চুক্তির মূল ধারাগুলো (যেমন: ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, সেনাশিবির প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক পরিষদকে শক্তিশালী করা) পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়ে গেছে।

 

শান্তি বাহিনীর উত্তরসূরিদের মধ্যে বিভক্তি এসে জেএসএস (মূল), জেএসএস (সংস্কারপন্থী), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ইত্যাদি সশস্ত্র উপদলের জন্ম হয়েছে, যার ফলে উপজাতীয়দের নিজেদের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে।

 

নতুন মাত্রা (কেএনএফ):

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বান্দরবানকেন্দ্রিক কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর উত্থান পাহাড়ের নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

জিয়াউর রহমানের ‘নিরাপত্তা চশমা নীতি’ সাময়িকভাবে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে রুখে দিতে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সফল হলেও, তা পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাহাড়ের টেকসই শান্তি নিশ্চিত করতে সামরিক ও ডেমোগ্রাফিক কৌশলের ঊর্ধ্বে উঠে ভূমি বিরোধের স্থায়ী সমাধান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও সাংবিধানিক অধিকারের সুরক্ষা এবং সর্বস্তরের মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নই একমাত্র কার্যকর পথ।