শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক।। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী শনিবার। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সৈনিকের হাতে তিনি নিহত হন।শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মনসুর রহমান কলকাতায় প্রধান কেমিস্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। শৈশব ও কৈশোরের একটি সময় গ্রামে কাটিয়ে জিয়া পিতার সঙ্গে কলকাতায় এবং দেশ বিভাগের পর করাচিতে চলে যান।
এরপর শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি কাকুলে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে নিযুক্ত হন।
১৯৬০ সালে দিনাজপুর শহরের বেগম খালেদা খানমের (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে জিয়াউর রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধে দুর্ধর্ষ সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য যেসব কোম্পানি সর্বাধিক বীরত্বসূচক পুরস্কার লাভ করে, জিয়াউর রহমানের কোম্পানি ছিলো এদের অন্যতম। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে।
১৯৭১ সালে মেজর পদমর্যাদায় জিয়াউর রহমান ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা চালালে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কলুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মোকাবিলার জন্য দেশের মানুষকে আহ্বান জানান। । তার এই ঘোষণায় পাকিস্তানি হানাদারদের আকস্মিক আক্রমণে দিশেহারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রেরণা যোগায়।
মুক্তিযুদ্ধে প্রথমে সেক্টর কমান্ডার ও পরে ‘জেড ফোর্স’ -এর অধিনায়ক হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করেন জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাকে মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের আগস্টে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান। তবে ৩ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে গৃহবন্দি করা হয়। তবে ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি মুক্ত হন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম পদত্যাগ করলে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। ওই বছর ৩০ মে এক গণভোটে জনতার রায় নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে তার বৈধতা নিশ্চিত করেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ৩০০টির মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে।
রাষ্ট্রপতি থাকাকীলন সময়ে জিয়াউর রহমান দেশে উন্নয়ন ও সংস্কারের অভূতপূর্ব মাত্রা যোগ করেন। প্রবর্তন করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়নের উপর জোর দেন, যা আগে অবহেলিত ছিল। রপ্তানি খাতের উন্নয়নে তিনি প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির প্রসারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। খাল খননের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যার সুফল পান কৃষকেরা। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে দেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। জিয়াউর রহমানের কর্মপরিকল্পনা ১৯-দফা কর্মসূচিতে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের উপর জোর দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমান সৈনিক জীবনে যেমন চরম পেশাদারীত্ব দেখিয়েছেন, তেমনই জাতীয় জীবনের সব সংকটে শক্ত হাতে হাল ধরেছেন। তার নেতৃত্বে দেশে যখন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি জোরদার হয়, তখনই ফের সক্রিয় হয় ষড়যন্ত্রকারীরা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে জনপ্রিয় এই রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের পেছনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সমাহিত করা হয়।
প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদায় দলের প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যুবার্ষিকী বিএনপি পালন করে আসেছে। দিবসটি উপলক্ষে শহীদ জিয়ার মাজারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, দোয়া–মোনাজাতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতা–কর্মী অংশ নেন। অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, থাকে কয়েক দিনব্যাপী কর্মসূচি। এবারও দলটি সারা দেশে ৮ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ২৫ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত সারা দেশে বিশেষ পোস্টার প্রকাশ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের কালো ব্যাজ ধারণ । দলীয় প্রতিষ্ঠাতা মৃত্যুবার্ষিকীর দিন শনিবার (৩০ মে) ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের সকল স্তরের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে।
একই দিন সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করবেন। জিয়ারত শেষে মাজার প্রাঙ্গণে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিটি থানায় এবং দেশের অন্যান্য ইউনিটে অসচ্ছল ও দুঃস্থ মানুষের মাঝে কাপড়, চাল, ডালসহ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
একইভাবে দেশের সব জেলা, মহানগর ও অন্যান্য ইউনিটেও ৩০ মে ভোর ৬টায় দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। স্থানীয় সুবিধা অনুযায়ী আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং দুঃস্থদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচিও পালন করা হবে। পরদিন ৩১ মে রোববার বেলা ২টায় রাজধানীর রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তক। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ নিয়ে গঠিত সার্ক প্রতিষ্ঠারও স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তিনি।
জাতীয়তাবাদভিত্তিক একটি কালজয়ী রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। শহীদ জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান এবং নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশের মানুষের বিপুল আস্থা ও সমর্থন নিয়ে এবারসহ বিএনপি এ পর্যন্ত পাঁচবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।











