হামে আক্রান্ত অর্ধেক মৃত্যু হাসপাতালে ভর্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে
ডেস্ক রিপোর্ট।। দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুর অর্ধেকের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই। বাকি অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাধীন পাঁচ দিনের মধ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) ২১ জেলার ৬০টি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দেখা গেছে, মৃত শিশুর প্রায় অর্ধেক সংখ্যকের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। বেশির ভাগের বয়স ছিল এক বছরের নিচে।
ডিজিএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তির দিনই মারা গেছে ছয় শিশু। ভর্তির দুদিনের মধ্যে মারা গেছে আরও ২৪ শিশু। পাঁচ দিনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩০ শিশুর। সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটির বয়স ছিল তিন মাস এবং সবচেয়ে বেশি বয়সী ছিল ৯ বছরের।
মৃতদের মধ্যে ২৯ শিশু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা গেছে। এর মধ্যে ১৫ শিশুর বয়স ছিল ছয় মাস বা তারও কম। দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। ফলে এসব শিশু টিকা পাওয়ার আগেই সংক্রমিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার তালিকায় দেখা যায়, মৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসাধীন ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচ), এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালগুলোতে। আক্রান্তের বেশির ভাগই এসেছে চাঁদপুর, ভোলা, বরগুনা, পাবনা, কুষ্টিয়া, সিলেট, কক্সবাজার, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশুর উপসর্গ ছিল জ্বর, কাশি, র্যাশ, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া। কয়েকজনের ক্ষেত্রে খিঁচুনি, মেনিনগোএনসেফালাইটিস, সেপটিক শক ও তীব্র অপুষ্টির মতো জটিলতাও ছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি, অপুষ্টি এবং দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে হামের জটিলতা বাড়ছে, বিশেষ করে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দুই কারণে হাসপাতালে ভর্তির পর দ্রুত মৃত্যু হচ্ছে। এক, অনেক শিশুর আগেই জটিল রোগ ছিল, যেমন– হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট। দুই, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর অধিকাংশ শিশুর নিউমোনিয়া হচ্ছে। হঠাৎ অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে। অনেকের আইসিইউ প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, শিশুদের ফুসফুস ছোট হওয়ায় হামের পর নিউমোনিয়া দ্রুত জটিল আকার নেয়। অনেক রোগী বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে পরে বিশেষায়িত হাসপাতালে আসে। এতে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, হামে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে এলেই দ্রুত তাদের অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত বুকের দুধ খাওয়া শিশুরা মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির কারণে অন্তত ৯ মাস পর্যন্ত হাম থেকে সুরক্ষিত থাকার কথা। এ কারণেই ৯ মাস বয়সে প্রথম টিকা দেওয়া হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়স থেকেই এই সুরক্ষা কমতে শুরু করতে পারে। এবার ছড়ানো হামের ভাইরাসে আগের স্ট্রেইনের তুলনায় কোনো মিউটেশন বা গঠনগত পরিবর্তন হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ বিষয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
সংক্রমণের চিত্র
হাম ও হামের উপসর্গে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৯ শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে হামে মারা গেছে তিন শিশু আর এই ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ছয় শিশু।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গত এক দিনে সারাদেশে আরও ১ হাজার ১০৫ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৬৭। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ২৪ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, এক দিনে মারা যাওয়া ৯ জনের মধ্যে চারজন ঢাকা বিভাগের। সিলেটে দুজন মারা গেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় একজন করে মারা গেছে। এদিকে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৫৬ জন। নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৬৮ জন। মোট মৃত্যু হয়েছে ৪২৪ জনের।
সাড়ে ৯ কোটি ডোজ টিকা আনছে সরকার
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে আগামী এক বছরের জন্য টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন রোগের ৯ কোটি ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। ইউনিসেফের মাধ্যমে ১০ ধরনের টিকা সংগ্রহের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ৮৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। গতকাল সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলতি মাসের শুরু থেকেই টিকার চালান দেশে আসা শুরু হয়েছে। গত ৩ মে প্রথম চালানে ১৫ লাখের বেশি আইপিভি ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছেছে। এরপর ৬ মে আরও ১৫ লাখ ডোজ এমআর এবং ৯ লাখ ডোজ টিডি ভ্যাকসিন দেশে এসে পৌঁছেছে।
তিনি আরও জানান, ১০ মে পর্যন্ত দেশে এমআর, টিডি, বিসিজি, টিসিভি, ওরাল পোলিও, পেন্টাসহ বিভিন্ন ক্যাটেগরির ১ কোটি ৩২ লাখ ডোজ টিকা এসে পৌঁছেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ভ্যাকসিনের পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে জানান তিনি।
ডা. জাহেদ বলেন, দেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ এমআর টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যা ইতোমধ্যে শতভাগ অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে টিসিভি ও এইচপিভি ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং নতুন সরবরাহের ফলে আগামী ৮ থেকে ১২ মাস টিকার কোনো সংকট হবে না।











