ঢাকা | নভেম্বর ১, ২০২৬ - ৮:২০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

Uncategorized

১০ এপ্রিল,বিশ্ব হোমিওপ্যাথি দিবস

 

সপ্তদশ শতকের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, হোমিওপ্যাথির আবিষ্কর্তা মহাত্মা স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের ২৭১তম জন্মবার্ষিকী ও হোমিওপ্যাথি দিবস-২০২৬ এ তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। এবং সকল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, হোমিও অনুরাগী এবং দেশ-বিদেশে অবস্হানরত সকল রোগীদের জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

মহাত্মা হ্যানিম্যানের জীবনী ও কর্ম হচ্ছে অধ্যয়ন, সত্যানুসন্ধান এবং আদর্শ ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে দারিদ্র ও প্রতিকূল পরিবেশের কঠোর আত্মবিশ্বাসযুক্ত পরিশ্রম, পর্যবেক্ষণ ও অধ্যবসায়ময় অবিচল সংগ্রাম ও তার সফলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তাই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, শিক্ষক ও হোমিওপ্যাথিক অনুরাগীর উচিত হ্যানিম্যানের জীবনী ও কর্ম থেকে বাস্তব শিক্ষা নেয়ার জন্য এ বিষয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা।

হ্যানিম্যান একটি পারিবারিক পদবী। ডা.হ্যানিম্যান ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল জার্মানীর স্যাক্সনী রাজ্যের ক্ষুদ্র নগরী মিসেনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গডফ্রায়েড হ্যানিম্যান এবং মাতার নাম জোহনা ক্রিশ্চিয়ানা। হ্যানিম্যানের বাল্যশিক্ষা এবং লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় তার মা-বাবার কাছেই। পরবর্তীতে তিনি বহুভাষাবিদ অর্থাৎ ১১ টি ভাষায় সুপণ্ডিত, বৈজ্ঞানিক, রসায়নবিদ, উদ্ভিদ বিদ্যায় পারদর্শী, সার্জন, সমাজবিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যের রক্ষক হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেন।

তার অসাধারণ ভাষাজ্ঞান ও অনুবাদ কর্ম পরবর্তীকালে অসংখ্য লেখার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং নিজেও তা থেকে ব্যাপক জ্ঞান লাভ করেন।

 

প্রথম জীবনে ডা.হ্যানিম্যান ছিলেন একজন এম.ডি. ডিগ্রীধারী স্বনামধন্য এলোপ্যাথিক চিকিৎসক। তিনি লক্ষ্য করেন,এলোপ্যাথি পদ্ধতিতে অসদৃশ্য বা বিসদৃশ্য লক্ষণে যে ঔষধ প্রয়োগ করা হয় তা প্রাণীদেহে পরীক্ষিত ঔষধ এবং ঐ ঔষধের মাত্রা শক্তি সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণা না থাকায় রোগী সাময়িক উপশম হলেও আরোগ্য হয় না এবং এসব ঔষধ বারবার ব্যবহার করার ফলে অনেক দুঃসাধ্য ও অসাধ্য রোগের সৃষ্টি হয়।

তিনি আরো লক্ষ্য করেন, প্রচলিত এলোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি আন্দাজ- অনুমান,ব্যক্তিগত মতামত ও কিছু অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত।

একজন এলোপ্যাথিক চিকিৎসক হিসাবে নিজের চিকিৎসা জীবনে হ্যানিম্যান,প্রচলিত এলোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যর্থতা ও কুফল উপলব্ধি করে এলোপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি থেকে সরে আসেন এবং নিজেকে অনুবাদকের কাজে নিয়োজিত করেন।

১৭৯০ সালে ডা.উইলিয়াম কালেন (Dr.Willium Cullen) এর ইংরেজিতে লেখা ” A Treatise of the Materia Medica” অনুবাদকালে একটা বিষয়কে প্রমাণ করতে তিনি নিজের সুস্থ দেহে সিঙ্কোনা প্রুভিং করে ঔষধের নিশ্চিত ক্রিয়া দেখেন এবং সদৃশ্য নিয়মে আরোগ্য পদ্ধতি তথা

হোমিওপ্যাথি আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা,

ও গবেষণা করে ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে “ঔষধের আরোগ্যকারী শক্তি নির্ধারনের নতুন নিয়মনীতি এবং পুরানো নিয়মনীতি সম্পর্কে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে প্রকাশ করেন এবং তাঁর এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিকে সর্বপ্রথম “হোমিওপ্যাথি” নামে আখ্যায়িত করেন।

১৮০১ সালে তিনি ২য় বার ‘বেলেডোনা’ ঔষধটি নিজদেহে প্রুভ করেন এবং আরক্ত জ্বরের প্রতিষেধক হিসাবে তিনি ‘বেলেডোনা’ ব্যবহারের নির্দেশ দেন।১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে টাইফাস ও হসপিটাল জ্বরে যথাক্রমে ব্রায়োনিয়া ও রাসটক্স ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

তিনি হাম,বসন্ত ইত্যাদি মহামারী রোগের জন্য প্রতিষেধক ঔষধের কথা ও উল্লেখ করে গিয়েছেন(ডা.হ্যানিম্যান রচিত অর্গানন অব মেডিসিন গ্রন্হের ৩৩ নং সূত্রের ১৭ ফুটনোটে উল্লেখিত নির্দেশনা মোতাবেক)।

এভাবে তিনি নিজ দেহে, আত্মীয়-স্বজন,সহযোগী ও শুভানুধ্যয়ীদের দেহে মোট ৯৯টি ঔষধ প্রুভ করে আধুনিক যুগের চিকিৎসা সংকট নির্ধারণ, সমাধান ও উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন।

তিনি প্রচলিত এলোপ্যাথিক চিকিৎসার সমালোচনা, বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি ও হোমিওপ্যাথি বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধও বই লিখেন।

তিনি তাঁর জীবনে এলোপ্যাথিক চিকিৎসকদের নিকট হতে বিভিন্নভাবে প্রচন্ড বাঁধার সম্মুখীন হন এবং হোমিওপ্যাথির বিরুদ্ধে শতাধিক পত্র-পত্রিকা, পুস্তিকা প্রভৃতি রচিত হয়,এমনকি হোমিওপ্যাথির উপর নিষেধাজ্ঞা জারীর অপচেষ্টা ও করা হয়।কিন্তু শত বাঁধা সত্ত্বেও তিনি সত্যের পথে অবিচল ছিলেন।

ডা. হ্যানিম্যান এলোপ্যাথিক চিকিৎসকদের বিরোধিতার জবাব দিয়েই কেবল ক্ষান্ত হননি,তিনি তাদেরকে আদর্শ নিয়ম-নীতি ভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক ও নির্ভরযোগ্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির অনুসারী হতে আহ্বান জানান।

 

আধুনিক যুগে বিশ্বের সর্বশেষ আবিষ্কার সবচেয়ে আধুনিক প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হলো এই হোমিওপ্যাথি।প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে তিনি মানব কল্যাণে মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়ে গেছেন।চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটির যেন তুলনা হয় না।

হ্যানিম্যানের সমগ্র জীবনী ও কর্ম আমাদেরকে আদর্শ ও সত্যের জন্য তথা হোমিওপ্যাথির শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, প্রচার,প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য যাবতীয় প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে অবিচল সংগ্রাম করতে, আদর্শ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে এবং জনগণের আদর্শ আরোগ্য ও স্বাস্থ্য রক্ষায় নিজেদের নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে সীমাহীন অনুপ্রেরণা যোগায়।তাই,

হ্যানিম্যানের শিক্ষণীয় জীবনী এবং মহামূল্যবান কর্ম ও অবদানের জন্য একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে,মৃত্যুর বেশ কিছু আগে তিনি যথার্থই বলেছিলেন,”আমি বৃথা জন্মিনি (Non Inutilis Vixi)”।

 

লেখিকা-ডা. অশ্রু কনা চৌধুরী, ডাঃ জাকির হোসেন সিটি কর্পোঃ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,

স্বাস্হ্য বিভাগ,চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম

সম্পর্কিত