সার্বভৌমত্বের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও বিশ্বব্যবস্থায় নতুন নৈরাজ্যের উত্থান
মো. মামুন হাসান।। বিংশ শতাব্দীর ধ্বংসস্তূপ থেকে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক আইনের যে সুশৃঙ্খল কাঠামো গত আট দশক ধরে বিশ্বকে এক আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা উপহার দিয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তিম ভোর তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে তেহরানের সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বাহিনীর এই বিধ্বংসী আঘাত কেবল একটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন নয় বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ওয়েস্টফেলিয়ান মডেল এবং লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই একক সামরিক উচ্চাভিলাষ প্রমাণ করেছে যে সমকালীন বিশ্বরাজনীতিতে আন্তর্জাতিক আইন এখন আর রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ঢাল নয় বরং তা থুসিডাইডিয়ান ট্র্যাপ বা উদীয়মান ও বিদ্যমান শক্তির দ্বন্দ্বে এক অকার্যকর কাগুজে দলিলে পরিণত হয়েছে। এই আক্রমণ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরাচরিত কাঠামো আজ রুল অফ ল থেকে বিচ্যুত হয়ে ল অফ দ্য জাঙ্গল বা জঙ্গলরাজত্বে প্রবেশ করেছে।
রাজনৈতিক বাস্তববাদ বা রিয়ালিজমের নগ্ন নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে রাষ্ট্রসমূহ শেষ পর্যন্ত নৈতিকতা বা আইনি কাঠামোর চেয়ে নিজস্ব ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকেই পরম সত্য বলে মেনে নেয়। হ্যান্স মর্গেনথাউ এর পাওয়ার পলিটিক্স তত্ত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রকৃতিগতভাবেই এক নৈরাজ্যবাদী ব্যবস্থা যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ নেই। গত কয়েক দশক ধরে আমরা যে প্যাক্স আমেরিকানার ছায়াতলে বাস করেছি তা ছিল মূলত মার্কিন আধিপত্যের একটি কৌশলগত মোড়ক মাত্র। যখনই কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মার্কিন এক্সেপশনালিজম বা ব্যতিক্রমবাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখনই তারা তা নির্দ্বিধায় চূর্ণ করেছে এবং বর্তমান ইরান সংকট সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। থমাস হবসের বর্ণিত সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধের সেই আদিম রূপটিই যেন আজ আধুনিক ড্রোনের ডানায় ভর করে ফিরে এসেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলপ্রয়োগকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও ২০২৬ সালের এই হামলা সমস্ত আইনি রক্ষাকবচকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল দুটি নির্দিষ্ট পথ খোলা রাখা হয়েছে যার একটি হলো অনুচ্ছেদ ৫১ অনুযায়ী আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার এবং অন্যটি হলো নিরাপত্তা পরিষদের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সম্মিলিত সামরিক অভিযান। ২০২৬ সালের এই হামলা এই দুই শর্তের কোনোটিই পূরণ করে না। ওমানের মাস্কাটে যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোমাসি সফল হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে এই আক্রমণ মূলত কৌশলগত প্রতারণার এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ। এটি ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বিস্মার্কীয় কূটনীতির ব্যর্থতা এবং ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তির অসারতাকে তীব্রভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এই ডিক্যাপ্যিটেশন স্ট্রাইক মূলত গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে কোনো দেশের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক আন্তর্জাতিক অপচেষ্টা।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো ইরানের অভাবনীয় সাংগঠনিক দৃঢ়তা ও কৌশলগত অভিযোজন ক্ষমতা। সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দেশটির সংবিধান অনুযায়ী তিন সদস্যের একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদ কর্তৃক নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আয়াতুল্লাহ আল উজমা সৈয়দ মুজতবা খামেনি। নতুন এই নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তিনটি অটল দাবি পেশ করেছেন। প্রথমত আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমস্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার। দ্বিতীয়ত ইরানের ওপর আরোপিত সকল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বিলোপ এবং তৃতীয়ত দীর্ঘকালীন ক্ষতির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
এই সংকটময় মুহূর্তে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ হাজির করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউরেশীয়বাদ দর্শন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ আজ মার্কিন একমেরু বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। হার্টল্যান্ড থিওরি অনুযায়ী যারা ইউরেশিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই বিশ্ব শাসন করবে। রাশিয়া ও চীন আজ ইরানকে সেই হার্টল্যান্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে। ১৯০৪ সালের রুশ জাপান যুদ্ধ বা বিংশ শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধের ছায়ায় আজ রাশিয়া তার সামরিক অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে এবং চীন তার অর্থনৈতিক বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। এটি মূলত জন মিয়ারশাইমারের অফেন্সিভ রিয়ালিজম বা আক্রমণাত্মক বাস্তববাদের এক বহিঃপ্রকাশ যেখানে রাশিয়া ও চীন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে মার্কিন আধিপত্যকে রুখে দিতে চায়।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে হিজবুল্লাহ হামাস এবং হুতিদের ভূমিকা কেবল প্রক্সি বা ছায়া শক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের প্রতিরোধ অক্ষ বা এক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স এখন একটি স্বতন্ত্র ভূরাজনৈতিক দর্শনে রূপান্তরিত হয়েছে। হিজবুল্লাহর সামরিক পেশাদারিত্ব হামাসের জনভিত্তি এবং হুতিদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি রণকৌশলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাদের দর্শন মূলত সিমেট্রিক বা সুষম যুদ্ধের বদলে অ্যাসিমেট্রিক বা অসম যুদ্ধ এবং হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনামী গেরিলাদের যে প্রতিরোধ বিশ্ব দেখেছিল আজ মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রতিরোধ যোদ্ধারা সেই একই দর্শনে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে প্যাক্স আমেরিকানার পতন ত্বরান্বিত করছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার দেওয়া আল্টিমেটাম অনুযায়ী আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে দাবিগুলো পূরণ না হলে ইরান হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক রণকৌশলের বিচারে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির নাভিশ্বাস তুলে দেওয়ার নামান্তর। ক্ষমতার ভারসাম্য তত্ত্ব অনুযায়ী যখন একটি অতিরাষ্ট্র এককভাবে আগ্রাসী হয়ে ওঠে তখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে বৃহত্তর প্রতিপক্ষ শক্তির সাথে জোটবদ্ধ হয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া যা পল কেনেডির কৌশলগত অতিবিস্তার তত্ত্বের আলোকে মার্কিন সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করতে পারে।
ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার প্রকৃতি বিশ্লেষণে বলা যায় যে আমরা এক বহুমেরুবিশিষ্ট বিশ্বের দিকে ধাবিত হচ্ছি যেখানে স্মার্ট পাওয়ারের চেয়ে র পাওয়ার বা নগ্ন পেশিশক্তিই হবে শেষ কথা। ১০ এপ্রিলের আল্টিমেটাম যদি বাস্তবায়ন হয় তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় পেট্রোডলারের আধিপত্য কমে যাবে এবং বিকল্প মুদ্রা বা ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে এটি হবে একটি গ্রে জোন কনফ্লিক্ট যা প্রথাগত যুদ্ধ এবং শান্তির মধ্যবর্তী এক ধূসর এলাকা যেখানে প্রক্সি ওয়ারই হবে প্রধান হাতিয়ার। কার্ল ফন ক্লজউইটজ বলেছিলেন যে যুদ্ধ হলো ভিন্ন উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিকতা তবে ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতিই এখন যুদ্ধের দাসে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে সার্বভৌমত্বের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে যদি আমরা এক নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়তে না পারি তবে শক্তির এই দম্ভ পুরো মানবসভ্যতাকে এক রক্তক্ষয়ী অন্ধকারের দিকে ধাবিত করবে। ইমানুয়েল কান্টের চিরস্থায়ী শান্তি দর্শনের পরিবর্তে যদি স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত থিওরিই বিশ্বব্যবস্থার ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ায় তবে আগামীর পৃথিবী হবে কেবলই এক নিয়ন্ত্রণহীন নৈরাজ্যের বিচরণক্ষেত্র। আইনের মৃত্যু যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন ক্ষমতার ভারসাম্যই হয় পৃথিবীর শেষ চালিকাশক্তি যা আমাদের এক দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল সংঘাতের দায়ভার কাঁধে নিতে বাধ্য করবে।ইতিহাসের কাঠগড়ায় আজ শান্তি ও যুদ্ধের ব্যবধান কেবল একটি টেবিলের দূরত্বের সমান যেখানে সামান্য এক পলক ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হতে পারে অনাগত হাজারো প্রজন্মকে। বারুদ যখন আইনের ওপর কথা বলে তখন সভ্যতার সূর্য অস্তমিত হতে খুব বেশি সময় লাগে না।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।










