ঢাকা | মার্চ ১৬, ২০২৬ - ১২:০৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

ত্যাগ, নির্যাতন সহ্য করেও রামগড়ে বিএনপি’র রাজনীতিতে হাফেজ আহমেদ ভুঁইয়া

  • আপডেট: Sunday, March 15, 2026 - 8:38 pm

মোঃ সুমন খান।।

ত্যাগ, নির্যাতন এবং একটি পরিবারের দীর্ঘ ১৭ বছরের গল্প লিখেছেন তাঁর ছেলে ফরমানুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ আমলের ১৭ বছর আমাদের পরিবারের জন্য ছিল এক কঠিন সময়ের ইতিহাস। আমার বাবা একজন বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষ হওয়ায় তাকে এমন কোনো নির্যাতন নেই যা সহ্য করতে হয়নি।
মিথ্যা মামলা, হামলা, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক হয়রানি—এসব যেন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবার বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও নিরাপদ ছিল না। বারবার লুটপাট, চাঁদাবাজি এবং চাপের মধ্যে দিয়ে আমাদের পরিবারকে দিন পার করতে হয়েছে।
তখন এমন কোনো জাতীয় দিবস ছিল না যেদিন চাঁদা নিতে কেউ আসেনি। শুধু তাই নয়, অনেক সময় ব্যক্তিগত নানা অজুহাত দেখিয়েও চাঁদা নেওয়া হতো। না দিলে মামলা-হামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে উসুল করত তারা।
এখনও মনে পড়লে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় সেই দিনের কথা—যেদিন আমার বাবাকে চট্টগ্রামের বাসায় আনা হয়েছিল গুরুতর আহত অবস্থায়। তার পা ভাঙা, হাতের বাহু ভেঙে চামড়ার সঙ্গে ঝুলছিল, সারা শরীর রক্তে ভেজা। সেই ঘটনার খবর পরদিন দেশের অনেকগুলো দৈনিক পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু আজও আমরা জানি না ঠিক কী কারণে তখনকার ক্ষমতাসীনদের কিছু লোক এই বর্বর হামলা করেছিল।
তবে এর আগের দিনই আমাদের ব্রিকফিল্ডে তখনকার কিছু সরকার দলীয় লোক এসেছিল একজন জাতীয় নেতার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য চাঁদা নিতে। ওইদিন ক্যাশে টাকা কম থাকায় টাকা কম দেওয়া হয়েছিল—হয়তো সেটাই ছিল আমার বাবার “অপরাধ”।
৬০ উর্ধ্ব একজন বয়স্ক মানুষকে মারতে মারতে প্রায় ৪০০–৫০০ গজ দূরে একটি ভাঙা বাড়ির পাশে ফেলে রেখে যায়। হয়তো তারা ভেবেছিল তিনি আর বেঁচে নেই। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে দেশের চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়। হাতে-পায়ে স্টিলের কলাম লাগিয়ে চলতে হয়েছে বহু বছর। সেই চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আমরা লক্ষ লক্ষ টাকার ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলাম।
আর মামলার কথা কী বলবো—এমন হাস্যকর ও হয়রানিমূলক মামলাও করা হয়েছিল যে আমাদের নিজের ৪/৫টা পুকুর থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল অন্যের পুকুরের মাছ নাকি আমরা খেয়ে ফেলেছি।
এমন একটা সময় ছিল যখন আমার বাবাকে ঘরের চেয়ে কোর্ট বিল্ডিংয়েই বেশি দেখা যেত।
আর নাহলে গ্রেপ্তারের ভয়ে অন্যের বাসায় গিয়ে দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকতে হতো।
একটি পরিবার হিসেবে আমরা শুধু আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হইনি, মানসিক কষ্টও বহন করেছি দীর্ঘদিন। তবুও আমার বাবা তার রাজনৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাস থেকে কখনো পিছিয়ে যাননি। দলের জন্য, আদর্শের জন্য তিনি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এত কিছুর পরও কখনো নিজের এলাকা, কর্মস্থল বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি।
এখন তো অনেকেই রাজনীতি করে ১/২ বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। গ্রাম ছেড়ে শহরে, শহর ছেড়ে বিদেশে জায়গা, বাড়ি, বাসস্থান গড়ে; কিন্তু ওনারা ছিলেন ভিন্ন। ওনাদের কাছে দল, দলের আদর্শ, অস্তিত্ব—সবার আগে।
তাই শহরে, বিদেশে দূরের কথা—গ্রামের বাড়িটাও এখন টিনের।
আজ যখন সেই সময়গুলোর কথা মনে করি, তখন মনে হয় একজন রাজনৈতিক কর্মীর ত্যাগ ও সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। যারা কঠিন সময়ে দলের পাশে থেকেছে, দলের জন্য নিজের, পরিবারের, আত্মীয়-স্বজনদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দলের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের অবদান ও ত্যাগ স্মরণ করা এবং সম্মান দেওয়া প্রয়োজন।
মানুষ অতীত থেকেই শেখে। ত্যাগের মূল্যায়ন না হলে দেশে ত্যাগী নেতা জন্মাবে না। আমার বাবার এই গল্প শুধু একজন মানুষের গল্প নয়; এটি সেইসব মানুষের গল্প, যারা আদর্শের জন্য অনেক কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেও নিজেদের বিশ্বাস ধরে রেখেছে।
আমাদের আশা একদিন এমন একটি সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যেখানে ত্যাগের মূল্যায়ন হবে, অন্যায়ের বিচার হবে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।