ঢাকা | জুলাই ১৮, ২০২৪ - ৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

পার্বত্য সংকটঃ শান্তিতেই সমস্যা, সমতাই সমাধান

  • আপডেট: Monday, July 3, 2023 - 8:27 pm

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আখন্দ:

স্বাধীন বাংলাদেশের স্বর্গীয় একদশমাংশ সবুজের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম। রয়েছে ১২টি সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন কৃষ্টিকালচার ভাষা ইতিহাস ঐতিহ্য, তেমনি রয়েছে এসব সম্প্রদায়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম আগমনের ভিন্ন ভিন্ন বিরল ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহ। কৃষ্টিকালচার ও সংস্কৃতির জন্য বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ বিশেষভাবে সমাদৃত। উর্বর বনভূমি হওয়ায় পার্শ্ববর্তি রাষ্ট্র সমুহের সহানুভূতি কিংবা লালচক্ষু সর্বদা এদেশের ওপর থেকেই যায়। সেইসাথে রয়েছে শান্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তিচুক্তি) ও পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জনসাধারণের ভিন্ন ভিন্ন দাবি। ভিন্ন ভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ত্রিমূখী সমস্যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যাঁতাকলে পিষ্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যায় ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালের শান্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তি চুক্তি) যেমন জটিলতা সৃষ্টি করেছে, তেমনি ২০২৩ সালে এই চুক্তির পরিবর্তন ও সংশোধনের করে সমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের দুয়ারও খোলা রয়েছে।

শান্তিতেই সমস্যা!!!

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এমএন লারমা ও কতিপয় উপজাতীয় নেতা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) গঠন এবং জুম্মল্যান্ড নামে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরেন। এই দাবি সঙ্গত কারণেই সরকারের মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে সংগঠনটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি পিসিজেএসএসএর সামরিক শাখা শান্তি বাহিনী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করে।
১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অমরপুর এলাকার কল্যাণপুর নামক স্থানে শান্তি বাহিনীর ক্যাম্পে প্রীতি গ্রুপের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে পিসিজেএসএস এর সভাপতি এমএন লারমা নিহত হয়।
১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি থেকে শান্তি বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। এছাড়া ‘শান্তি বাহিনী’ কর্তৃক হত্যা, অপহরণ, গুম, জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টি এবং পুনর্বাসিত বাঙালিদের উপর নৃশংস হামলার ঘটনার পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ক্রমসই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ০২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তি চুক্তি) নামে পরিচিত। ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ তারিখে খাগড়াছড়ি জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেএসএস নেতা সন্তু লারমা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্রসমর্পন করেন।সর্বমোট চার দফায় মোট ৮৭৪টি অস্ত্র জমা দেয় এবং ১৯৪৬ জন সদস্য সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করে যাদের মধ্যে ৭১৫ জন সদস্যকে পুলিশ বাহিনীতে চাকুরী প্রদান করা হয়। পার্বত্য চুক্তির আলোকে ২৫ সদস্যের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করে জেএসএস এর সভাপতি সন্তু লারমাকে পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে অধিষ্ঠিত করে, যা (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন) আসন। পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ এবং ১৫টি আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো শান্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তি চুক্তি) হয়েছিলো পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং সরকারের মধ্যে কিন্তু বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাহাড়ি জনগোষ্ঠি সন্তু লারমাকে তাদের নেতা হিসেবে মানে না , যার কারণে পাহাড়ে আবির্ভব হয়েছে নতুন নতুন সন্ত্রাসী সংগঠনের।
গত ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন শান্তি বাহিনীর সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে অস্ত্র সমর্পণ করেন। কিন্তু একই দিন চুক্তির প্রত্যাখান করে সন্তু লারমার ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা। এরই ধারাবাহিকতায় জন্মনেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-সন্তু লারমা), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-মানবেন্দ্র লারমা), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-ডেমোক্রেটিক) নামক চারটি পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন।
সম্প্রতি কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে আরো একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের উত্থান ঘটেছে ৷ পাহাড়ে মোট পাঁচটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই সব সময়েই চলতে থাকে ৷
এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির নিমোক্ত ধারা সমূহ নিয়ে  প্রশ্ন তুলেছেন পাহাড়ে বসবাসরত (৫২%) বাংলাভাষী পাহাড়ী জনগোষ্ঠি।
১। Chittagong Hill Tracts Regulation (১৯০০ সালের ১নং আইন) সহ সকল প্রকার বিতর্কিত অসাংবিধানিক আইন সমূহমূ বাতিল করা।
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সংশোধন করে “উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল” এই অসাংবিধানিক শব্দগুলি বিলুপ্ত করা।
৩। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬ (২) অনুচ্ছেনু দ মোতাবেক জাতি হিসাবে বাঙালী এবং বাংলাদেশী নাগরিকত্বের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীকে অসাংবিধানিক ভাবে “অ-উপজাতি” হিসাবে অভিহিত না করা
৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হতে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সহ বিদ্যমান সকল আইন সংশোধন করে “অ-উপজাতি” শব্দ গুলি বিলুপ্ত করা।
৫। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীদের গুচ্ছ গ্রাম হতে তাদের স্ব-স্ব ভূমিতে পুনর্বাসন করে ভূমির অধিকার ফেরত সহ আর্থিক ক্ষতি পূরণ প্রদান করা।
৬। বাঙালীদের ভূমি জবর দখল চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কল্পে দ্রুত ভূমি জরিপ চালু করে ভূমি জরিপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তথাকথিত বিতর্কিত অসাংবিধানিক “ল্যান্ড কমিশন” এর সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখা।
৭। অবিলম্বে খাস জমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম চালু করা।
৮।পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক ক(১), খ(৩), ২৬(ক), গ(১০), (ঘ)১০ নং দফা সহ পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৬৪(১) (ক) ধারা অবিলম্বে সংশোধন করা।
৯। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঘ(৪) দফা সংশোধন পূর্বক ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের রায়, আদেশ কিংবা কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে (মহামান্য সুপ্রীম-কোর্ট) আপীল করার বিধান প্রনয়ন করা।
১০। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ঘ(৫) দফা সংশোধন করে “ল্যান্ড কমিশনে” তিন পার্বত্য জেলা হতে কমপক্ষে ০৩(তিন) জন বাঙালী প্রতিনিধি নিযুক্ত করার বিধান রাখা।
১১। কোটা সংরক্ষন ও বৃত্তি প্রদান সংক্রান্ত কথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১০নং দফা সংশোধন করে চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে “পার্বত্য কোটা”যুক্ত করা সহ  বিধানিকভাবে পাহাড়ের সকল ছাত্র/ছাত্রীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালী ছাত্র/ছাত্রীদেরকে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করে সকলের মাঝে সমতা নিশ্চিত করা।
এই সকল দাবী-দাওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বেড়াজালে বন্দি অবস্থায় আছেন।
তর্কের খাতিরে যদিও বলি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হোক,
তাহলে কি পাহাড়ে শান্তি ফিরবে???
উত্তরঃ না
কেন এই, না! পাহাড়ের এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-সন্তু লারমা), এর সঙ্গে তাহলে চুক্তি বিরোধী সংগঠন গুলো কি আদৌ হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে?
প্রশ্ন এখানেই থেকে যায়।
সেইসাথে সর্বদা পাহাড়ী জনগোষ্ঠিদের নিয়মিত নেতিবাচক ইন্দন দিয়ে যাচ্ছে তথকথিক নামধারী সুশিল সমাজের…
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল, এএলআরডির চেয়ারপারসন খুশী কবির, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, রিসার্স ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের (রিব) নির্বাহী পরিচালক মেঘনা গুহঠাকুরতা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত, সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী  সুব্রত চৌধুরী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সভাপতি জেড আই খান পান্না, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান,  সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার,  বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক  মো. নুর খান রা।
যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তিচুক্তি) করা হয়েছিলো পাহাড়ের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, সেখানেই অশান্তির সকল ধরণের জট লেগে আছে, যার ফলে পাহাড়ের এই চুক্তির মধ্যদিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সুদুরপরাহত।

সমতাই সমাধান !!!

পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যখনই যে দল ক্ষমতায় আসে, তখন সে দলের নেতারা জেলা পরিষদকে লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দু বানায়। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এসব মনোনীত নেতৃবৃন্দের কোন ধরণের দায়িত্ব কিংবা কর্তব্য নেই বললেই চলে। কেননা এই সকল জনপ্রতিনিধিগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন।
বান্দরবানের একজন প্রাক্তণ জেলা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য বলেন দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে আমি বান্দরবান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও এমপি পদে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। কারণ আমি বাঙালি। বাঙালি হওয়ার কারণে আমি বৈষম্যের শিকার। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা (৫২%) সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির কারণে চরম বৈষম্য এবং অবহেলার শিকার। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলো উপজাতিদের দখলে। সরকারি চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা – বাণিজ্যে বাঙালিরা চরম বৈষম্য এবং অবহেলার শিকার।
পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের ০৯ জন সদস্যের মধ্যে ০৭ জন সদস্যই উপজাতি এছাড়াও বাকি যে দুজন আছেন তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা নন। যার কারণে কমিশনের সকল সিদ্ধান্ত বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেতে পারে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসাধারণ মনে করেন। যার প্রতিফলন স্বরুপ ভূমি বন্দোবস্তির জন্য দেয়া আবেদনের মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়। উপজাতীয়রা সর্বমোট ২২,৯৭০টি আবেদনপত্র জমা দিলেও পক্ষান্তরে বাঙালিরা মাত্র ৫০০টি আবেদনপত্র জমা দেয় যা বাঙালিদের পক্ষ থেকে ভুমি কমিশনের উপর অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে উপজাতিরা নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং তারাই তালিকা করেন কাদেরকে বরাদ্দ দেয়া হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় প্রতিনিধিদের তালিকায় কোনো বাঙালির না থাকায় উপজাতি জনগোষ্ঠী এককভাবে এর পুরোটা লাভ করছে।
উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে।  প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২৫ জন উপজাতি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে কোটাতেই। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুধু  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই শুধুমাত্র ৩৩টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
পাহাড়ের উপজাতি জনগোষ্ঠী করের আওতামুক্ত হলেও বাঙালিদের কর দিতে হচ্ছে। বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০ শতাংশ উপজাতিদের আর বাকি ৯০ শতাংশ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হলেও তার বেশির ভাগ পায় উপজাতিরা।
এছাড়াও উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় ৫ শতাংশ আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় ১৬ শতাংশ।
পাহাড়ের দেড় শতাধিক এনজিওর মাধ্যমে প্রায় কয়েক হাজার প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই বাঙালি অধিবাসীরা উক্ত প্রকল্পে চাকুরীর সুযোগ পাচ্ছে না।
বিশেষ করে বঞ্ছিত হচ্ছে বসতি ও চাষের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান এই তিন জেলাতে মোট ৮৬টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এগুলো ২৬ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বাড়লেও বাড়িনি রেশন কার্ড এর সংখ্যা।
বিভিন্ন গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাহাড়ে বসবাসতে (৫২%) বাংলাভাষী পাহাড়ীরা। থাকার জায়গার অভাবে গরু, ছাগল, হাস-মুরগী এবং মানুষ একই ঘরে বসবাস করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে খাগড়াছড়ির একটি এলাকায় ৫৬টি পরিবারকে ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাসের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।
উপজাতি সন্ত্রাসীদের অব্যাহত বিরোধীতা ও আক্রমণের কারণে ১৯৮৮ সালে তাদেরকে একটি গ্রামে একত্রিত করে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ৫৬টি পরিবারকে ২৫ শতাংশ বসতি জমি এবং পৌনে চার একর চাষযোগ্য জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ৩০ বছর পর সেই ৫৬ পরিবার এখন ৪০০ পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশও বাড়েনি, বাড়েনি সুযোগ-সুবিধা।
ইতি টানার পূর্বে পার্বত্য অঞ্চল (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি,বান্দরবান) এর অসম নেতৃত্বের কিছু নমুণা উপস্থাপন করা হল।
এক তরফা নেততৃ ও কর্তৃত্ব নিয়ে স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। একচেটিয়া নেতৃত্বের কারনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমতা, ন্যায্যতার দাফন-কাফন সম্পন্ন হয়েছে। যার কারনে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক বৈষম্য দিন দিন বেগবান হচ্ছে। এখানে ৫২% বাংলাবাষী পাহাড়ী জনগোষ্ঠী বসবাস করলেও তাদের মধ্য থেকে নির্বাহী পদে কোন ধরনের জনপ্রতিনিধি রাখা হয় নাই। একনজরে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ আসনসমূহে চোখ রাখি তাহলেই দেখা যায় বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব ক্যা শৈ হ্লা মারমা, রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব অং সুই প্রু চৌধূরী, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব মংসুইপ্রু চৌধূরী অপু ,বান্দরবান বোমাং সার্কেল চীফ (রাজা) জনাব উ চ প্রু চৌধুরী, রাঙামাটি চাকমা সার্কেল চীফ (রাজা) জনাব ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, খাগড়াছড়ি মং সার্কেল চীফ (রাজা) জনাব সাচিং প্রু চৌধুরী, বান্দরবান সংসদ সদস্য জনাব বীর বাহাদুর উশৈসিং, রাঙামাটি সংসদ সদস্য জনাব দীপংকর তালুকদার, খাগড়াছড়ি সংসদ সদস্য জনাব কুজেন্দ্র লাল ত্রিপূরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী জনাব বীর বাহাদুর উশৈসিং, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব জোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সস্তু লারমা), পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব নিখিল কুমার চাকমা। এছাড়াও সরকার দলীয় (ক্ষমতাসীন) সংগঠনের সভাপতি ক্যা শৈ হ্লা  (বান্দরবান জেলা),  দিপংকর তালুকদার (রাঙামাটি), কুজেন্দ্র লাল ত্রিপূরা (খাগড়াছড়ি)। তিন পার্বত্য জেলায়  একজন সংরক্ষিত আসনের  মহিলা এমপি বাসন্তি চাকমা, (খাগড়াছড়ি) স্বরণার্থী প্রত্যবাসন ও পুর্নবাসন বিষয়ক টাক্সফোর্সের চেয়ারম্যান জনাব কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। এ থেকেই স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে পার্বত্য চট্টগ্রামে উচ্চ পদস্থ আসনে কোন বাংলাবাষী (৫২%) জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্বের আসনে বসানো হয় নাই।
উপরোক্ত অবস্থান গুলো বিশ্লেষন করলে দেখা যায় এইখানে শুধুমাত্র তিনটি সম্প্রদায় (মারমা, চকমা, ত্রিপুরা) ব্যতিত বাকি ৯টি পাহাড়ী জনগোষ্ঠিকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদি এই সকল অবস্থানে সমতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্টা করা না হয় তাহলে শান্তির সম্ভাবনা কাল্পনিক।
আর এই সকল অসমতায় জনসংখ্যানুপাতে নের্তৃত্বে ও কর্তৃত্বে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইবে বলে সকলের প্রত্যাশা।

লেখকঃ সাংবাদিক ও পার্বত্য গভেষক।