ঢাকা | মে ৭, ২০২৬ - ২:২৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

সিকদার পরিবারের ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চিন্তিত ব্যাংক

  • আপডেট: Thursday, May 7, 2026 - 11:48 am

ডেস্ক রিপোর্ট।। আওয়ামী লীগ আমলে নানা ক্ষেত্রে ছিল সিকদার পরিবারের দাপট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ২০০৯ সালে জয়নুল হক সিকদার ন্যাশনাল ব্যাংক দখল করে গড়ে তোলে রাজত্ব। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাংকটি থেকে একে একে ছয় এমডিকে বিদায় করা হয়। আইন ভেঙ্গে সিকদার পরিবারের ৫ জন সদস্য ব্যাংকটির পরিচালক হয়ে যান।

এভাবে ব্যাংকটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের প্রভাবশালী পরিচালকদের সমঝোতার ঋণ, কমিশন নিয়ে ভুয়া ঋণ, বেনামি ঋণ কিংবা উচ্চ দরে ব্যাংকের কাছে ভবন ভাড়া দিয়ে টাকা কামানো যেন এই পরিবারের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি সিকদার পরিবারের সদস্যদের কয়েকজনের মৃত্যুতে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণের কী হবে সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। এ নিয়ে ব্যাংকগুলো চিন্তিত। কেননা, দেশে তাদের যে সম্পদ রয়েছে ঋণের তুলনায় তা সামান্য।

ন্যাশনাল ব্যাংক দখলের পর থেকে সিকদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। এরপর তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার চেয়ারম্যান হন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মনোয়ারা সিকদার যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছেন।

তাদের সাত সন্তানের মধ্যে প্রধানত দেশের সব কিছু দেখাশোনা করতেন রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার। গত ৪ মে দুবাইর একটি হাসপাতালে মারা গেছেন রন হক সিকদার। আরেক ভাই রিক হক সিকদারও হাসপাতালে ভর্তি বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর এই পরিবারের কাউকে আর দেশে দেখা যায়নি। জয়নুল হক সিকদারের মেয়ে পারভীন হক সিকদার আওয়ামী লীগের সময়ে সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সিকদার গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ১১টি ব্যাংকে ঋণের তথ্য পেয়েছে।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা ঋণ চিহ্নিত হয়। সব মিলিয়ে এখন এ পরিমাণ ঠেকেছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায়। বিভিন্ন উপায়ে নেওয়া ঋণের বড় অংশই পাচার করে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এসব দেশে তাদের হোটেল, রেস্তোরাঁ, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে।

সরকার শেখ হাসিনা পরিবার ও সিকদার গ্রুপসহ দশ ব্যবসায়ী গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার নিয়ে যৌথ তদন্ত দল গঠন করে কাজ করছে। তদন্ত দল এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে সিকদার পরিবারের সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। সিকদার পরিবারের কারণে সমস্যায় পড়া ১১টি ব্যাংক চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ তালিকায় ন্যাশনাল ব্যাংক ছাড়া রয়েছে– ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, এক্সিম, প্রিমিয়ার, এবি, আইএফআইসি, জনতা এবং অগ্রণী ব্যাংক।

জানা গেছে, সিকদার গ্রুপের পাচারের অর্থ ফেরত আনার আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদেশি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য বিনিময় চুক্তি করেছে অগ্রণী, আইএফআইসি ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। সিকদার পরিবারের হাতে যাওয়ার পর থেকে ব্যাংকটির চরম অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে দুই ভাইয়ের সঙ্গে বোন পারভীন হক সিকদারের দ্বন্দ শুরু হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ব্যাংকটি থেকে সিকদার পরিবারের সব সদস্যকে বের করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিকদার পরিবারের ১৪ সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেয়। ওই সময় বেঁচে থাকা তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার ছাড়াও রিক হক সিকদার, রন হক সিকদার, পারভীন হক সিকদার, দীপু হক সিকদার, মমতাজুল হক সিকদার, নাসিম সিকদার ও লিসা ফাতেমা হক সিকদার ছিলেন তালিকায়।

এ ছাড়া ছিলেন নাসিম সিকদারের মেয়ে মনিকা খান সিকদার, রিক সিকদারের দুই ছেলে শন হক সিকদার ও জন হক সিকদার, তাদের পরিবারের সদস্য সালাহউদ্দিন খান, জেফরী খান সিকদার ও মেন্ডি খান সিকদার।

 

ন্যাশনাল ব্যাংক বেশ আগে থেকে দুর্বল অবস্থায় থাকলেও এস আলম গ্রুপের দুই হাজার ২৮৩ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নজিরবিহীনভাবে ব্যাংকের আয় খাত বিকলন করে সুদ মওকুফের পর ২০২২ সালে ব্যাংকটি তিন হাজার ২৬০ কোটি টাকার লোকসান করে। মূলত ওই সময় এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকও সিকদার গ্রুপকে অতিরিক্ত ঋণসহ নানা সুযোগ দেয়।

 

২০২০ সালে এক্সিম ব্যাংকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন করে সিকদার গ্রুপ। জামানত ছাড়া বিপুল অঙ্কের এ ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন রন হক সিকদার ও তাঁর ভাই দীপু হক সিকদার।

সিকদার পরিবারের খারাপ আচরণের কারণে একে একে পাঁচজন এমডি পদ হারানোর পর ব্যাংকটি আর এমডি খুঁজে পাচ্ছিল না। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিশিষ্ট ব্যাংকার মেহমুদ হোসেন দুই বছরের জন্য এমডি পদে যোগদান করেন। তবে এক বছর এক মাসের মাথায় বনানীর সিকদার হাউসে ডেকে নেন রন হক ও রিক হক সিদকার। সেখান থেকে ফিরে পদত্যাগ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডে সিকদার পরিবার ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এক কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ডলার পাচার করে বলে তথ্য উঠে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে।

গত মাসে জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকায় থাকা সিকদার গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান হলো পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড ও সিএলসি পাওয়ার।