ঢাকা | জুন ২৮, ২০২৬ - ৯:৪৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

শখ থেকে ৫০ একরের বাগান, পাহাড়ে বিদেশি ফল চাষে সফলতা

  • আপডেট: Sunday, June 28, 2026 - 7:04 pm

মিরসরাই প্রতিনিধি

উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢালুতে গাছে গাছে ঝুলছে নানা জাতের ফল। চারিদিকে দৃষ্টি গেলে সবুজের সমারোহ চোখে পড়বে। চোখে পড়বে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ।

এর মধ্যে কোনো গাছের ডালে ফল ঝুলছে, আবার কোনো গাছে ফুল আসছে। বছরের ১২ মাসেই কোনো না কোনো ফল থাকবে এই বাগানে। এই বাগানে দেশি-বিদেশি প্রায় অর্ধশত ফলের গাছ রয়েছে।

বাগানটি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পাহাড়ে গড়ে তুলেছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. ওমর শরীফ। নামকরণ করেছেন তার মায়ের নামে ‘জোহরা এগ্রো ফার্মস অ্যান্ড নার্সারি’।

জানা গেছে, শুধু মিরসরাই কিংবা চট্টগ্রামে নয়, বাংলাদেশে প্রথম কয়েকটি ফলের আবাদ হয়েছে এই বাগানে। বাগানে অ্যাভোকাডো, থাই সফেদা, পিচ ফল ও এলাচসহ বিশ্বের নামিদামি অনেক দুর্লভ ফল ও মসলার চাষ হচ্ছে। পাহাড়ের মাটিতে ভিনদেশি ফলের বিপ্লব ঘটিয়েছেন তিনি। যুক্ত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা দুর্লভ ও মূল্যবান সব গাছের চারা।

গত ২০ জুন মিরসরাই উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে মৌসুমি ফল মেলায় নিজের বাগানে উৎপাদিত প্রায় ৪০ জাতের ফলের প্রদর্শনী করে পুরস্কার অর্জন করেছেন। পাশাপাশি ফল মেলায় আগত দর্শনার্থীরা অবাক হয়েছেন এক বাগান থেকে এত ফলের উৎপাদন দেখে।

২০০৩ সালে শখের বসে পাহাড়ে বাগান শুরু করেছেন ওমর শরীফ। শুরুটা সহজ ছিল না। সমতল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বাগানে যেতে হতো। রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রমে প্রায় ৫০ একর আয়তনের স্বপ্নের বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। তার সংগ্রহে রয়েছে দেশি-বিদেশি অনেক ফুল, ফল ও ঔষধি গাছের চারা।

চারা সংগ্রহ করতে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছুটে গেছেন ভিনদেশেও। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব ও পার্শ্ববর্তী ভারতে গেছেন বেশ কয়েকবার।

স্বপ্ন ছিল এক সময় দেশে গড়ে তুলবেন সব ধরনের দুর্লভ গাছের চারা। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা ও সততার ওপর ভর করে বুকভরা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন শরীফ। তার দেখাদেখি উৎসাহ পেয়ে ও সহযোগিতা নিয়ে অনেক বেকার যুবক গড়ে তুলেছেন বাগান।

তার বাগানে রয়েছে চাকাপাত আম, কিউজাই, ব্যানানা, রামগই, বারি-৪, গৌড়মতি, আম্রপালি, কাটিমন, ব্রুনাই কিং, চিয়াংমাই, মরিয়ম, কোকোনাট, মিয়াজাকি, অম্বিকা এবং জেসি জাতের আম।

এছাড়া রয়েছে তেঁতুল, চেনাক ফ্রুট, বারোমাসি মাল্টা, চাইনিজ কমলা, দার্জিলিং কমলা, চায়না-৩ লিচু, ভিয়েতনাম নারিকেল, গাব, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, লটকন, এমবি-২ আনারস, সিয়াম গ্রিন নারিকেল, থাই মিষ্টি লেবু, আমলকী, পিচ ফল, বেরিকেডেট মাল্টা, থাই সফেদা, থাই আমলকী, ড্রাগন, তিনফল, থাই জাম্বুরা, মাতুয়া, আবিও, কাঁঠাল, ডুরিয়ান, পুলসান, লিচু এবং কাজুবাদামসহ অর্ধশত ফলের গাছ।

আরও রয়েছে এলাচ, দারুচিনি, আদা ও লবঙ্গ। আছে সব ধরনের গাছের চারা। তার এই অভাবনীয় সাফল্য মিরসরাই তথা বাংলাদেশের পাহাড়ি কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

কথা হয় তরুণ উদ্যোক্তা ওমর শরীফের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০০৩ সালে শখের বসে পাহাড়ে কয়েকটি জাতের গাছের চারা রোপণ করে বাগান শুরু করেছি। ওই এলাকায় কারও যাতায়াত ছিল না। ধীরে ধীরে বাগানে বিভিন্ন জাতের ফলদ, মসলা ও ঔষধি গাছের বাগান গড়ে তুলেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই পর্যায়ে আসার পথটা অত সহজ ছিল না। চারা এনে লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায় না, এর চাষের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিও রয়েছে। তা বুঝতে সময় লেগেছে। রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তারপরও হাল ছাড়িনি। চাষপদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে পড়াশোনা করে তার প্রয়োগ ঘটিয়ে তবেই সফলতা এসেছে।’

ওমর শরীফ বলেন, ‘বিশ্বের নতুন নতুন উদ্ভাবিত ফল ও ফলের চারা সংগ্রহ করা নেশায় পরিণত হয়েছে। এরপর সেগুলো থেকে চারা গজিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করি।’

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ‘কৃষি উদ্যোক্তা ওমর শরীফের বাগানে দেশি-বিদেশি অনেক ফল উৎপাদিত হচ্ছে। তার ধ্যান-জ্ঞান সব নার্সারি ও বাগান নিয়ে। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে এই বাগান গড়ে তুলেছেন। এবার ফল মেলায় তিনি অনেক জাতের ফল প্রদর্শনী করেছেন। এই বাগানে অনেক দুর্লভ ফলের গাছ রয়েছে। তার দেখাদেখি অনেকে বাগান গড়ে তুলছে।’