টানা বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস, নিহত বেড়ে ২০
কক্সবাজার সংবাদদাতা।। টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার পাহাড়ঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত লাখো মানুষ চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এরই মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসের পৃথক ঘটনায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি মাদরাসার ওপর পাহাড়ধসে আট ছাত্রী নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১৩ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন ঘটনাস্থলে এবং আরও চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আহত পাঁচ শিশুকে বিভিন্ন ক্যাম্পের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর এ-৭/৩ ব্লকে খদিজাতুল কোবরা নুরানী ও হেফজখানায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, পাহাড়ধসের পর উদ্ধার হওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত পাঁচজনকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে (GK) হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি (IRC) হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে এবং ক্যাম্প কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড ক্যাম্প ম্যানেজমেন্ট (CCCM) স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। এপিবিএন (APBN) সদস্যরা ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং আরআরআরসি কর্মকর্তারা পুরো উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কাজ করছে। পাহাড়ধসে আনুমানিক ৩০ শিক্ষার্থী চাপা পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদেক জানান, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদরাসা এবং তার ওপরে একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে নির্মিত মাদরাসাটির পাশের পাহাড় টানা বৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পাহাড়ের ঢাল ধসে ভবনটির ওপর পড়ে এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) রাতে উখিয়ার তিনটি পৃথক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজন নিহত হন। পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ধসে নিহত হন মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস।
একই রাতে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।
পরে রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে নিহত হন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)।
নতুন এই দুর্ঘটনায় গত কয়েকদিনে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার দুপুর প্রায় ২টা ১০ মিনিটে টানা বর্ষণের কারণে ক্যাম্প-৫-এর মেইন ব্লকের এ/৩ উপ-ব্লকে অবস্থিত খদিজাতুল কোবরা নুরানী মহিলা মাদরাসা ও হেফজখানার ওপরে থাকা প্রায় ১২ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর নির্মিত একটি মক্তব ও মসজিদের দেয়াল ধসে নিচের হেফজখানার একাংশের ওপর পড়ে। সে সময় হেফজখানায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রী কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করছিল। আকস্মিক এ ঘটনায় বহু ছাত্রী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
খবর পেয়ে ইরানী পাহাড় পুলিশ ক্যাম্পের টহল দল, অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য, স্থানীয় রোহিঙ্গা, এপিবিএন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ক্যাম্প-৫-এর সিআইসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাশ দাফনের অনুমতি দেন।
প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিচয় জানা গেছে, শাহিদা (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), ওমাইচা বিবি (১৩) ও রাশিদা (১৬)। আহত হয়েছেন আসরা (৯), বেগম জান (১৫), ফারেসা বিবি (১২), জান্নাত আরা বিবি (৮), নূর ফাতেমা (১০), নুর সেহেরা (১২), আব্দুল মোনাফ (১৭) ও নূর কায়েস (১০)। তাদের মধ্যে কয়েকজন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, জিকে হাসপাতাল ও ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ক্যাম্প-১৪-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “মানবিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।”
এদিকে একই সময়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা, দরিয়ানগর, উখিয়া ও পেকুয়ায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রবন্দরসমূহে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রতিকূল আবহাওয়া আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
রোহিঙ্গা মাঝি দিল মোহাম্মদ বলেন, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যান। হিফজ খানার ভেতরে আরও অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন।
উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত আটজনের লাশ উদ্ধারের কথা জানতে পেরেছি। উদ্ধার কাজ চলছে, তবে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।”
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হানান জানান, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানরত সবাইকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। ইউএনও, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ কর্মকর্তাসহ একাধিক টিম মাঠে রয়েছেন।
এছাড়া উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।











