ঢাকা | মে ২৪, ২০২৬ - ১:৫৮ পূর্বাহ্ন

হাম ও উপসর্গে ৬৮ দিনে ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু

  • আপডেট: Saturday, May 23, 2026 - 12:58 pm

ডেস্ক রিপোর্ট।। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু বেড়েই চলেছে। হাম প্রতিরোধে সরকার নানা উদ্যোগের কথা বললেও টিকাদান কর্মসূচির বাইরে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সিলেটেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ৬৮ দিনে হাম ও হামের জটিলতায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ জনে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে টিকা উৎপাদন এবং আক্রান্ত শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। এর পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালে আলাদা চিকিৎসা ইউনিট চালু এবং পুষ্টিহীন শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, টিকার সরবরাহ সংকট এবং জনসচেতনতার অভাবে দেশে হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। এর প্রভাব এখন শিশুমৃত্যুর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে হামের সংক্রমণ আবার বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। আক্রান্তদের শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, হামে শিশুমৃত্যু কমাতে সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। হাম পরিস্থিতিকে জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে টিকা ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য অনিয়ম তদন্ত এবং ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু নতুন আইসিইউ স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও নিশ্চিত করতে হবে। হামের জটিলতা কমাতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার বড় পরিসরে সমন্বিত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। তবে সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১১ শিশুর মধ্যে ৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং দুজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ জনে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪১৪ জন, হামে আক্রান্ত হয়ে ৮৫ শিশু মারা গেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ১ হাজার ২৬১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ শিশুর শরীরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৮ হাজার ৩২৯ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৭ হাজার ৫১১ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৪৩ হাজার ৪১১ শিশু।

১৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে
নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চললেও অন্তত ১৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। গত চার বছরে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং গত বছর ভিটামিন-এ কর্মসূচি বন্ধ থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল শুক্রবার (২২ মে) ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়। সমাবেশ থেকে কভিড-১৯ সময়ের টিকা ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগের শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ফয়জুল হাকিম বলেন, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে সারাদেশে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গত জানুয়ারিতে কক্সবাজার রোহিঙ্গাশিবিরে এক শিশুর হাম শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হলেও সরকার ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, কভিড-১৯ সময় টিকা ক্রয়ে দুর্নীতি, করোনা মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনা এবং শতাধিক চিকিৎসকের মৃত্যুর বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। এসব ঘটনার তদন্ত ছাড়াই স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফয়জুল হাকিম আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে পৃথক ওয়ার্ড, চিকিৎসক-নার্সদের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের জাতীয় পরিষদ সদস্য কাজী ইকবাল বলেন, সরকারি হাসপাতালে ‘ইউজার ফি’ চালু এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর কার্যক্রমে যথাযথ তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক কাইয়ুম হোসেন হামে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং মৃত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন-এর নেতা উজ্জ্বল বালো বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচির প্রচার আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশ থেকে ১৬ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনার তদন্ত, স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা, জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন, হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গার্মেন্টসসহ বেসরকারি শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ছয় মাসের বৈতনিক মাতৃত্বকালীন ছুটি, ওষুধের দাম কমানো এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে টিকা উৎপাদন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, হামে আক্রান্ত একজন রোগী আরও ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হামে আক্রান্ত শিশুর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দ্রুত দেখা দেয়। তিনি বলেন, যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের অনেকেই হামের পাশাপাশি অন্য রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। হাম শনাক্ত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। ঈদের পরে আবার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকা না আসায় অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। সেই সংকটের প্রভাবেই বর্তমান পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।