ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ৬, ২০২৬ - ২:২০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

শ্বাসমূলের স্পন্দন থেকে সমৃদ্ধির মানচিত্র: সুন্দরবন পর্যটনে তারুণ্যের উদয়

  • আপডেট: Thursday, February 5, 2026 - 11:39 pm

মো. মামুন হাসান।। বিখ্যাত পর্যটক ও দার্শনিক ইবনে বতুতা বলেছিলেন, “ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে এবং তারপর তোমাকে একজন গল্পকথকে পরিণত করবে।” বর্তমান বিশ্বে পর্যটন কেবল গল্প বলার মায়াবী মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক শিল্প। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (WTTC) তথ্যমতে, ২০৩৩ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের তরুণদের সামনে এই পরিসংখ্যান এক বিশাল স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ বা পর্যটনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় এক সময় যে তরুণরা বনের সম্পদ নষ্ট বা হরিণ শিকারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটত, আজ তারা হতে পারে প্রকৃতির অতন্দ্র প্রহরী ও সফল উদ্যোক্তা। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হতে পারে আমাদের এই উপকূলীয় পর্যটন।

উদ্ভাবনী উদ্যোগের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের তরুণরা ‘অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR) ট্যুরিজম’ প্রবর্তন করতে পারে। যার মাধ্যমে পর্যটকরা বনের ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত না করেই ভিআর চশমার সাহায্যে বাঘের আনাগোনা কিংবা বনের গহীনের দৃশ্য দেখতে পাবেন। বিদেশি পর্যটকরা এখন আর বিলাসবহুল হোটেলের চার দেয়ালে বন্দি থাকতে চান না; তারা চান ‘ইমারসিভ এক্সপেরিয়েন্স’। সাতক্ষীরার বাগদা চিংড়ি বা উপকূলীয় কৃষিপদ্ধতি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরে ‘ফার্ম-স্টে’ ধারণা চালু করা সম্ভব। কল্পনা করুন এমন এক অভিজ্ঞতার, যেখানে একজন পর্যটক উপকূলের একজন বনজীবীর মাটির ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করছেন। তিনি সকালে জেলের সাথে জাল ফেলে নিজ হাতে মাছ ধরবেন এবং সেই টাটকা মাছই মাটির উনুনে স্থানীয় মশলায় রেঁধে খাবেন। আধুনিক বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুরা ঠিক এই মাটির স্বাদই খুঁজছেন। উপকূলীয় তরুণরা যদি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পরিবেশবান্ধব ‘মাটির রিসোর্ট’ বা ঐতিহ্যবাহী ঘর তৈরি করতে পারে, তবে তা হবে বিশ্বমানের এক আকর্ষণ।

সুন্দরবনের পর্যটন মানেই রোমাঞ্চ। সন্ধ্যার পর বনের নিস্তব্ধতায় যখন অন্ধকার নেমে আসবে, তখন বাঘের ভয়ে শরীরে যে শিহরণ বা ছমছমে ভাব তৈরি হবে, সেটিই পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। গোলপাতার ছাউনির নিচে রাত কাটানোর সময় যদি মাঝরাতে হঠাৎ বনের গহীন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন ভেসে আসে, তবে সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পর্যটকের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। আর এই রোমাঞ্চকে আরও প্রাণবন্ত করতে রাতে উঠোনে আয়োজন করা যেতে পারে স্থানীয় লোকসংগীত বা বনবিবির পালাগানের আসর। উপকূলের নিজস্ব সংস্কৃতি ও লোকগাঁথার এই সুর পর্যটকদের নিয়ে যাবে এক আদিম ও অকৃত্রিম জনপদে। তরুণরা যখন এই ধরণের ‘হেরিটেজ ট্যুর’ পরিচালনা করবে, তখন পর্যটন কেবল ব্যবসায়িক পণ্য থাকবে না, তা হয়ে উঠবে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী বিজ্ঞাপন।

বিশ্বের অন্যতম সফল পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘কোস্টারিকা’ আজ তাদের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে কেবল ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে। আমাদের তরুণদের এই আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে। আমরা শিক্ষার্থীদের কেবল আতিথেয়তা শেখাচ্ছি না, বরং তাদের ডিজিটাল লিটারেসি, ক্রস-কালচারাল কমিউনিকেশন এবং এন্টারপ্রেনারশিপ শেখানোর মাধ্যমে বিশ্ববাজারের উপযোগী করে তুলছি। পর্যটনে আমরা এমন এক মডেল গড়ে তুলতে চাই, যেখানে বর্জ্য হবে সম্পদ এবং স্থানীয় হস্তশিল্প হবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। উপকূলীয় নারীরা যখন হস্তশিল্পে যুক্ত হবেন এবং তরুণরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই পর্যটনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেবেন, তখন প্রতিটি গ্রাম হবে একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যটন পল্লী।

অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস বলেছিলেন, “উদ্ভাবনই একজন নেতা ও অনুসারীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।” সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের তরুণদের আজ অনুসারী নয়, বরং নেতা হতে হবে। তারা যখন সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট ইকো-ক্যাফে, মাটির রিসোর্ট কিংবা স্মার্ট ট্যুর গাইডেন্স সার্ভিস গড়ে তুলবে, তখন এই অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত হবে এবং বন রক্ষা পাবে। পরিশেষে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্মার্ট ট্যুরিজম হতে পারে আমাদের তুরুপের তাস। সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দক্ষ জনবল যখন মাঠ পর্যায়ে এই উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করবে, তখন সুন্দরবন কেবল মানচিত্রের একটি সবুজ রেখা থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও গ্রিন-ইকোনমির মূল চালিকাশক্তি। প্রকৃতি ও পর্যটনের এই সেতুবন্ধনে তরুণরাই হবে আমাদের আগামীর সমৃদ্ধির প্রধান স্থপতি।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।