ঢাকা | মার্চ ২৮, ২০২৬ - ৫:৩০ অপরাহ্ন

“রেল খেকো বেলাল ওএসডি” চেয়ার ফিরে পেতে মন্ত্রীর দুয়ারে তদবির

  • আপডেট: Saturday, March 28, 2026 - 2:16 pm

কামাল পারভেজ:

রেলওয়ে অঙ্গনে সুপরিচিত নাম রেল খেকো প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) বেলাল। বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের সময়ে রেলের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—দুই অঞ্চলে যার একচেটিয়া আধিপত্য ছিল বলে সর্বমহলে সমালোচিত। রেলওয়ে দপ্তরের নাম বদলে যেন বেলাল সরকার দপ্তর বলেই সবাই চিনত।

পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ আর দুদকে মামলা থাকার পরও বহাল তবিয়তে চালিয়ে গেছে ঘুষ বাণিজ্য আর টেন্ডার সিন্ডিকেট কর্মকাণ্ড। একবার সাসপেন্ড হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে তা প্রত্যাহার করে পূর্বের চেয়ার ফিরে পেতে সক্ষম হয়। বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের সময়টা যেন তার নিয়ন্ত্রণের স্বর্গরাজ্য ছিল। দুদকের মামলা যেন তাকে ছুঁতেও পারেনি। এত অপরাধ আর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই করত ঘুষ লেনদেন ও ফাইল নয়ছয়। রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরী ও তার ছেলে ফরাজ করিম চৌধুরীর আশীর্বাদে নাকি যতসব অপকর্ম করেও সবকিছু থেকে পার পেয়ে যেত। ২০২০ সালে রেলের টেন্ডারের কাজ না করেই ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে বহিষ্কার হলেও স্বপদে ফিরে নজির স্থাপন করে বেলাল হোসেন সরকার। সেই সময় বিভিন্ন পত্রিকায় ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হয়—বেলাল উধাও। অবশ্যই কানাডা পাড়ি দিতে সব প্রস্তুতি নিলে, তখনই ফজলে করিম চৌধুরীর আশীর্বাদে পুনরায় চাকরিতে যোগদান করে।

বেলালের ওএসডি মিষ্টিমুখ:

“১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ৮ কোটিতে ক্রয়”—এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর দৈনিক জাগো জনতা পত্রিকায়। সংবাদ প্রকাশের পরপরই নড়েচড়ে বসেন চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হলে ঐ তদন্ত কমিটি অপারগতা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে দুই সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। “১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ৮ কোটিতে ক্রয়: পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন” শিরোনামে ১১ মার্চ দৈনিক জাগো জনতাসহ আরও কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বেলাল হোসেন সরকার, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, পাহাড়তলীকে গত ১৫ মার্চ ২০২৬ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন, উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) স্বাক্ষরিত ও স্মারক নং- ৫৪.০০.০০০.০০০.০৪০.১৯.০০১৯.২২.৩৬৬ মূলে মহাপরিচালক দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তার স্থলে মো. আনোয়ারুল ইসলাম, সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পশ্চিম), রাজশাহীকে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম বদলি করা হয়।

ঐদিকে বেলাল হোসেন সরকারকে ওএসডি করার খবর পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেই সর্বমহলে যেন কানাঘুষা শুরু হয়, ক্যান্টিনের টেবিলগুলো হয়ে ওঠে চাঙা। অনেকের মাঝে চলে মিষ্টিমুখ। অনেকের মধ্যে বলাবলি করছে—আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের মধ্য দিয়ে রেল খেকো বড় ফ্যাসিবাদের উইকেট পড়ল।

সিসিএস বেলালের জীবন বিলাস:

বেলাল হোসেন সরকার ২২তম বিসিএস ব্যাচ। ২০০৩ সালে চাকরিতে যোগদান করে। গাইবান্ধা জেলায় তার আদিবাড়ি। কলেজ ও বুয়েটে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় থাকলেও তৎকালীন বিএনপি নেতাদের সাথে আঁতাত করে এক মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে চাকরি পায়। পরবর্তীতে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বন্ধুমহলে বেলাল সুচতুর বলেও জানা যায়। তার সুবিধা আদায়ের জন্য সব দলের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সক্ষম। বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের সময়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে ওঠে। তারপরও থেমে থাকেনি অপকর্ম। ধরাকে সরা জ্ঞান করাই ছিল বেলাল হোসেনের কাজ। উপরস্থ কর্মকর্তা থেকে নিম্নস্তরের কর্মচারী—সবাই যেন তার অধীনস্থ কর্মচারী ছিল। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো তাকেই হেনস্তা হতে হতো। বদলি করে দিত জেলা দপ্তরে। কর্মকর্তারাও একরকম জিম্মি থাকত, কারও কোনো টু-শব্দ করার ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলেছিল।

বিগত ১৫ বছরে আলাদ্দীনের চেরাগ বাতি যেন তার বগলের নিচে রেখে পাহাড়সম অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছে। গাইবান্ধা পলাশবাড়ীতে ১০ বিঘা সম্পদ, গাইবান্ধা জেলা শহরেও ৮ বিঘা সম্পদ ক্রয় করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিকে দুটি আইকনিক ফ্ল্যাট ও একটি ৪ হাজার স্কয়ার ফিটের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা যায়। পরিবারের জন্য দুই বছর পরপর নতুন মডেলের মিতসুবিশি কার, যার মূল্য হতে হবে ৫০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে, উপহার হিসেবে দিত।

সরকারি চাকরি ও সিন্ডিকেট ঠিকাদারি:

বেলাল হোসেন সরকার যে একজন সরকারি কর্মকর্তা তাই নয়, চাকরির পাশাপাশি গড়ে তুলেছিল ঠিকাদারি ব্যবসা। গোপন বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরী ও তার ছেলে ফরাজ করিম চৌধুরীর Next Generation Graphics Ltd (NGGL), যা Fav Diesel Sales & Service গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত—উক্ত গ্রুপের মালিকানায় (অলিখিত চুক্তিতে) রয়েছে। কখনো কোনোদিন দুদক মামলা বা কোনো আইন তাকে আটকাতে না পারে—সুকৌশলে কাজগুলো করে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী সরকারের আমলে দুটি ওয়াশিং প্ল্যান করা হয়—একটি ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশনে, আরেকটি রাজশাহী রেলস্টেশনে। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ছিল। এই প্রকল্পের পিডি ছিল ফকির মুহিউদ্দীন, বর্তমান রেলভবনে জেডিজি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বেলাল হোসেন সরকার ও ফকির মুহিউদ্দীন দুজনের সিন্ডিকেট করে রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরী ও তার ছেলে ফরাজ করিম চৌধুরীর Next Generation Graphics Ltd (NGGL), যা Fav Diesel Sales & Service—এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি করা হয়। বর্তমানে ওয়াশিং প্ল্যান আতুরের ঘরে পরিণত হয়ে পড়ে আছে। বিষয়টি নিয়ে কয়েক কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে জানা যায়—প্রথমত টেকসই হয়নি, দ্বিতীয়ত পরিকল্পনাবিহীন করা হয়েছে এবং সরকারের হাজার কোটি টাকা পুরোটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট:

বাংলাদেশ রেলওয়ে দপ্তরকে বলা হয় কমিশন বাণিজ্যের দপ্তর। যে কোনো টেন্ডার পেতে হলে আগেভাগেই কর্মকর্তাদেরকে ১০% থেকে ২০% কমিশন দিয়ে দিতে হয়। এই নিয়মটি চালু করে বেলাল হোসেন সরকার। রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল ও চট্টগ্রাম পূর্বাঞ্চলের কয়েক কর্মকর্তাকে নিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ ওঠে। বেলালের কথায় রাজি না হলে এবং তার সাথে চুক্তি না করলে কাজ চলে যাবে তার অলিখিত মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে। ঐদিকে আওয়ামী সরকারের পতনের পর সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করে জামায়াতের সাথে।

তদবির চলছে মন্ত্রীর দুয়ারে:

প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) বেলাল হোসেন সরকারকে হঠাৎ ওএসডি করে দেওয়া হবে—সে ভাবতেই পারেনি। দপ্তরে চেয়ারবিহীন হওয়াতে মাথা খারাপের মতোই নাকি ঘুরছে মন্ত্রণালয়। রেলমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করছে—সে ছাত্রদলের কর্মী ছিল, এখন ষড়যন্ত্রের শিকার। মন্ত্রী মহোদয়কে বোঝানোর জন্য ফকির মুহিউদ্দীন ও এক সচিবসহ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।