ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ১৬, ২০২৬ - ৮:১৫ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

পর্যটন খাতের নবজাগরণে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা

  • আপডেট: Monday, February 16, 2026 - 5:38 am

 

মো. মামুন হাসান।। প্রকৃতির অবারিত দান। আর হাজার বছরের ঐতিহ্যে ঘেরা এই বাংলাদেশ যেন বিধাতার নিজ হাতে আঁকা এক অনন্য ক্যানভাস। তবে এই ক্যানভাসে পর্যটন শিল্পের যে পূর্ণাঙ্গ ছবি ফুটে ওঠার কথা ছিল তা দীর্ঘকাল ধরে। কিন্তু সঠিক মহাপরিকল্পনা এবং সদিচ্ছার অভাবে ম্লান হয়ে আছে।

বর্তমানে একটি নবনির্বাচিত সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করছে তখন আপামর জনতা বিশেষ করে পর্যটন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্যমতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ এখন পর্যটন নির্ভর অথচ আমাদের এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম কাউন্সিল বা ডব্লিউটিটিসি এর সর্বশেষ প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১০.৩ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে যেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হার এখনো ৩ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ যা আমাদের বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকদের খরচ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৩ সালে এই খাত থেকে আয় হয়েছিল ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার যা ২০২৪ সালে নেমে এসেছে প্রায় ৪৪ কোটি ডলারে অর্থাৎ এক বছরেই আমরা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বাজার হারিয়েছি। এই নিম্নমুখী প্রবণতা রোধে নবনির্বাচিত সরকারকে কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয় বরং বৈপ্লবিক ও কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে হবে। পর্যটনকে কেবল বিনোদন হিসেবে না দেখে একে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে আমাদের প্রধান বাধা হলো আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব এবং জটিল ভিসা নীতি যা পর্যটকদের আগমনে নিরুৎসাহিত করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যেখানে ২০২৪ সালে পর্যটন খাত থেকে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে এবং শ্রীলঙ্কা ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে তাদের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে সেখানে আমরা পিছিয়ে আছি কেবল আধুনিক বিপণন কৌশলের অভাবে।

শ্রীলঙ্কার মতো একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র যদি তাদের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ১২ শতাংশের উপরে নিয়ে যেতে পারে তবে বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে এটি দ্বিগুণ হওয়া সম্ভব।

সরকারকে অন অ্যারাইভাল ভিসার পরিধি বহুগুণ বাড়ানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ও ব্যবহারকারীবান্ধব ই ভিসা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে যাতে একজন বিদেশি পর্যটক নিজের ঘরে বসেই কয়েক মিনিটের মধ্যে ভ্রমণের অনুমতি পেতে পারেন। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি ট্রানজিট পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী ঢাকা হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গমন করেন। দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মতো আমাদের সরকারও যদি তাদের জন্য স্বল্পকালীন ট্রানজিট ভিসা এবং বিমানবন্দর থেকে কাছাকাছি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে যাওয়ার বিশেষ শাটল সার্ভিস চালু করে তবে দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে। পাশাপাশি প্রতিটি প্রধান পর্যটন স্পটে ডিজিটাল ট্যুরিস্ট কার্ড চালু করা যেতে পারে যার মাধ্যমে ক্যাশলেস পেমেন্ট নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটকদের অবস্থান ও সার্বিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

পর্যটন খাতের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল ও অভাবনীয় সুযোগ রয়েছে যা আমাদের দেশে এখনো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। দেশের প্রতিটি পর্যটন এলাকায় স্থানীয় তরুণদের দক্ষ গাইড হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের ওপর উচ্চতর শিক্ষা নিশ্চিত করা হলে হাজার হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে।

সরকার যদি পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্টার্টআপ বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করে তবে গ্রামীণ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের হোম স্টে বা ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠবে। এতে কেবল শহরমুখী জনস্রোত কমবে না বরং স্থানীয় হস্তশিল্প ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং আমাদের লোকজ সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে স্বমহিমায় পৌঁছে যাবে। থাইল্যান্ডের সফল ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট মডেল অনুসরণ করে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আশেপাশের গ্রামগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী পর্যটন খাতে প্রতি ১ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রায় ৭৮ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান সম্ভব যা শিল্প খাতের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া মেডিকেল ও ওয়েলনেস পর্যটনের ধারণাটি আমাদের পরিকল্পনায় যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি কারণ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ক্রমবর্ধমান উন্নত চিকিৎসা সেবা কাজে লাগিয়ে বিদেশের রোগীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

টেকসই উন্নয়ন বা সাস্টেইনেবল টুরিজম হওয়া উচিত বর্তমান সরকারের উন্নয়নের মূল দর্শন ও চালিকাশক্তি। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আমরা পর্যটন শিল্পকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারব না। ভুটান যেখানে উচ্চমূল্য ও সীমিত পর্যটক নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে তাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করছে আমাদেরও তেমনি সেন্ট মার্টিন সুন্দরবন কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে পর্যটকদের প্রবেশাধিকার বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। প্লাস্টিক বর্জন এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে গ্রিন টুরিজম সার্টিফিকেট ব্যবস্থা চালু করতে হবে যা আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমাকে পর্যটনের আওতায় আনা সম্ভব। গভীর সমুদ্রে অত্যাধুনিক ক্রুজ শিপ চালনা এবং স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো আধুনিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা গেলে বাংলাদেশ একটি প্রিমিয়াম পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এছাড়া ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পর্যটনের প্রসার ঘটিয়ে বৌদ্ধ ও সুফি ঐতিহ্যের বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের পর্যটকদের একটি বড় অংশকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা অত্যন্ত সহজ হবে।

নবনির্বাচিত সরকার যদি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই খাতে বিশেষ কর রেয়াত এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত একটি একক জানলা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করতে পারে তবে বেসরকারি বিনিয়োগের এক বিশাল জোয়ার তৈরি হবে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিলে আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ কেবল পোশাক রপ্তানি বা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর না থেকে পর্যটনকেও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আমাদের মাটি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর মানুষের অকৃত্রিম মমতা ও আতিথেয়তা যদি সঠিক নেতৃত্ব ও দূরদর্শী পরিকল্পনার ছোঁয়া পায় তবে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে একটি অনন্য ও উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

 

লেখক- ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।