ঢাকা | মার্চ ২৫, ২০২৬ - ৫:৫৯ অপরাহ্ন

‘পরিবেশের অশনি সংকেত’ লামা-আলীকদম পানীয় জলের তীব্র সংকট

  • আপডেট: Wednesday, March 25, 2026 - 2:39 pm

‘পানির অপর নাম জীবন’—বিশ্ব পানি দিবসে জনগণের মাঝে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা খুবই প্রয়োজন। একদা আমাদের এই পাহাড়ে নদী-নালা, ঝিরি-ঝর্না ছিল পানির মূল উৎস। আজ ২২ মার্চ ‘বিশ্ব পানি দিবস’, অথচ এর কোনো সাড়া নেই আমাদের সমাজে।

হাল বাস্তবতায় নানান আগ্রাসনের কারণে জীবনবান্ধব পানির উৎসগুলো হারিয়ে গেছে। কারণ, টানা চার দশক তামাক চাষের ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের মিশ্রণে স্থানীয় নদী ও বড় বড় খাল-ছড়ার পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে গেছে এবং অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার ফলে নদী, ছড়া, ঝিরি ভরাট হয়ে গেছে।

অনেক স্থানে প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো ভরাট করে চাষের জমি বানানোর কারণে ঝিরিগুলো অনেকটা অস্তিত্বহীন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে প্রকাশ, পাহাড়ি এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক গভীরে, তাও আবার একেবারে অপর্যাপ্ত। ভূ-উপরিস্থ প্রাকৃতিক উৎস—নদী-নালা, ঝিরি-ঝর্নাগুলোই একমাত্র মিঠা পানির উৎস ও ভাণ্ডার।

যে হারে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে, তাতে এখানকার নদীর তীরে বসবাসকারীরাও আগামীতে সংকটে পড়তে পারেন।

১৯২০ সালে ব্রিটিশ শাসকরা এই অঞ্চলের ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা থেকে কিছু টেকসই জীবন ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

ব্রিটিশরা লামা-আলীকদমে পাহাড়ি নদী, ঝিরি-ঝর্নাগুলোতে প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বনায়নের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আলীকদমে প্রায় ১ লাখ তিন হাজার একর পাহাড়কে ‘মাতামুহুরী রিজার্ভ’ ঘোষণা করে কিছু অংশে বন সৃজন করেছিলেন। একই সময়ে লামা ঘেঁষে চকরিয়া মানিকপুর ও বমুবিলছড়ি এলাকায় রিজার্ভে বন সৃজন করেছিলেন।

প্রায় শত বছর আগে ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসকরা আমাদের এই অঞ্চলকে নিয়ে কত দূরদর্শী চিন্তা করেছিলেন, তা আজকের দিনে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা দরকার। কিন্তু এই সময়ে এসে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখতে পাই।

আমরা স্বাধীন বাংলার মানুষগুলো নিজেদের জীবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে চরম উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছি।

লামা-আলীকদমের ভুক্তভোগী নাগরিকরা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, এলাকায় পানীয় জলের তীব্র সংকট বিরাজ করছে। পার্বত্য এই উপজেলায় নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করে ইটভাটা ও তামাক চুল্লিতে কাঠ পোড়ানো হয়। এছাড়া বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে পানির প্রাকৃতিক উৎস প্রায় হারিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে পাহাড়ি ছড়া-নালা, ছোট ছোট জলাশয়গুলো।

খরস্রোতা মাতামুহুরী নদীর বুকে চর জেগে মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে। যে নদীতে স্থানীয়রা সাঁতার কেটে গোসল করতেন, বারোমাস নৌকা চলত, সেখানে কিছু দূর পরপর জেগে ওঠা খণ্ড-খণ্ড চরে তামাকসহ নানান ফসল চাষ হচ্ছে(!)।

এদিকে লামা-আলীকদম উপজেলায় প্রায়ই রিং টিউবওয়েলগুলো শুকিয়ে গেছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ কল অকেজো হয়ে আছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি সরবরাহের জন্য বিগত দিনে উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম পয়েন্টে জিএফএস (গ্রাভিটি ফ্লো সিস্টেম) এর মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তামাক চাষীরা ওইসব উৎস থেকে তামাক ক্ষেতে পানি ব্যবহার করা এবং রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় সেসবও এখন আর নেই।

এ ছাড়া পানি প্রবাহমান ছড়াগুলোতে কিছু দূর পরপর বাঁধ দিয়ে তামাক চাষীরা তাদের দখলে নেয়। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমের এই সময়টাতে স্থানীয় বাসিন্দারা পানীয় জলের তীব্র সংকটে ভোগছেন।

এই বাস্তবতায় পরিবেশবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড বন্ধ করে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের উৎসগুলোর সতেজতা ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায়, আগামী এক দশকের মধ্যে বসবাস অনুপযোগী হয়ে উঠবে এই জনপদ। সংশ্লিষ্ট মহল এই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন সমাজ।