ঢাকা | মার্চ ১৬, ২০২৬ - ১:১৮ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম মিরসরাই উপকূলে ছোট সুন্দরবন

  • আপডেট: Monday, March 16, 2026 - 10:12 am

মিরসরাই প্রতিনিধি।।

ইছাখালী ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলে চোখে পড়ে এক ব্যতিক্রমী সবুজ দৃশ্য। উত্তরে ইছাখালী ও দক্ষিণে ডাবরখালী খালের মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় খালের চারটি শাখার দুই পাড়জুড়ে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠছে গোলপাতার বন। দূর থেকে নারকেল চারার মতো মনে হলেও কাছে গেলে স্পষ্ট বোঝা যায়—এগুলো গোলপাতা গাছ। সুন্দরবন এলাকার পামজাতীয় উদ্ভিদখ্যাত ১০ হাজার গোলপাতা গাছ রয়েছে মিরসরাই উপকূলে। গাছগুলোর উচ্চতা ৬ থেকে ৭ ফুটের মতো।

উপকূলীয় বেড়িবাঁধের বাইরে খালের দুই ধারে বন বিভাগের লাগানো গোলপাতা গাছ বড় হচ্ছে। জেগে ওঠা চরের ভাঙন রোধ ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে খুলনার গোলপাতা লাগানো হয়েছে। এতে মিরসরাইয়ের বুকে তৈরি হচ্ছে ‘ছোট সুন্দরবন’।

উপকূলীয় রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তা বাঁধের বাইরে বিশাল এলাকাজুড়ে নতুন চর জেগে উঠেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ডোমখালী, মঘাদিয়া ও বামন সুন্দর বিট এলাকায় ৮২০ হেক্টর চরে বনায়ন করা হয়। বন বিভাগের সুফল প্রকল্পের আওতায় দুই বছর আগে করা বনায়নের আওতায় কেওড়া ও বাইন গাছের চারা রোপণ করা হয়। পাশাপাশি ইছাখালী বিট ও বামন সুন্দর বিটের অংশে থাকা চারটি শাখা খালের দুই পাড়ে ১০ কিলোমিটারজুড়ে গোলপাতার বীজ ও চারা লাগানো হয়। সুন্দরবন এলাকা থেকে গোলপাতার ২০ হাজার বীজ ও বরিশাল এলাকা থেকে ১০ হাজার গোলপাতার চারা আনা হয়। তবে চারাগুলোর শিকড় সংক্রমণে নষ্ট হয়ে গেলেও বীজ থেকে চারা গজিয়েছে। এরপর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও মহিষের বাথানের কারণে কিছু চারা গাছ নষ্ট হলেও এখনও ১০ হাজারের বেশি গাছ টিকে আছে। জোয়ারভাটার প্রবাহ ঠিক থাকায় নিরাপদ উচ্চতায় বেড়ে ওঠা এসব গাছ এখন দ্রুত বড় হচ্ছে। খালগুলোয় নিয়মিত জোয়ারভাটা হওয়ায় পলি জমে উর্বর হয়ে উঠেছে খালপাড়ের মাটি। সেই পলি মাটিতে দ্রুত বাড়ছে গোলপাতা গাছগুলো। স্থানীয়দের ভাষায়, আগে যেখানে ছিল খোলা খালপাড়, এখন সেখানে সবুজের আবরণ।

ইউকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গোলপাতার ইংরেজি নাম Nypa fruticans। এটি মূলত সুন্দরবনের স্বল্প ও মধ্যম লবণাক্ত অঞ্চলে জন্মে। পাতা সাধারণত ৩ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় ও মোহনা এলাকায় জন্মানো এই পামজাতীয় উদ্ভিদকে ‘নিপা পাম’ নামেও ডাকা হয়।

নাম গোলপাতা হলেও গাছটির পাতা গোল নয়। গাছের ফল যখন পূর্ণ বয়সে পৌঁছায়, তখন ফলের কাঁদিটি প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। সেখান থেকেই ‘গোলপাতা’ নামের প্রচলন হলেও প্রকৃত নাম গোল গাছ।

গোলপাতার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গুণ। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এর গুড় অত্যন্ত উপকারী। কারণ এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম (৩৫–৪১)। ইউকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায়, প্রাচীনকালে পুরুষদের স্নায়বিক দুর্বলতা দূর করা, বার্ধক্য প্রতিরোধ এবং পেটের রোগ সারাতে গোলপাতার রস ও গুড় ব্যবহার করা হতো।

সাহেরখালী ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গোলপাতার কথা শুধু বইয়ের পাতায় পড়েছি। সুন্দরবনে ঘরের ছাউনি দিতে গোলপাতা ব্যবহার হয়—এটা জানতাম। কিন্তু কখনও বাগান দেখিনি। এখন আমাদের উপকূলে গোলপাতার বন তৈরি হচ্ছে দেখে ভালো লাগছে।’

ডোমখালী এলাকার বাসিন্দা প্রাণহরি জলদাস বলেন, ‘নারকেল গাছের মতো দেখতে হওয়ায় শুরুতে আমরা চিনতে পারিনি। এখন সবাই জানে এগুলো গোলপাতা গাছ। গাছ হওয়ার কারণে খালের দুই পাড়ে পাখির আনাগোনাও অনেক বেড়েছে।’

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহান শাহ নওশাদ বলেন, ‘খালপাড়ের মাটি টেকসই করা, ভাঙন রোধ এবং উপকূলীয় এলাকায় জীববৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্যে সুফল প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে গোলপাতার বনায়ন করা হয়। নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে এখন এখানে একটি সুস্থ গোলপাতার বন গড়ে উঠছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাইরে গোলপাতার বন সম্প্রসারণ একটি চমৎকার উদাহরণ। এটি উপকূল রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’