ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০২৬ - ৫:৪২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাঙামাটি জেলা পরিষদের তরুণ সদস্য হাবীব আজমকে ঘিরে প্রাসঙ্গিক পুনর্মূল্যায়ন

  • আপডেট: Sunday, February 22, 2026 - 8:00 pm

হুমায়ুন কবির।।
কে এই হাবীব আজম, কেন তাকে নিয়ে লিখতে হলো-তা অবশ্যই পাঠকমণ্ডলীর আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার কথা। মো. হাবীব আজম হচ্ছেন রাঙামাটি শহরের কাঁঠাতলী এলাকার কৃতিসন্তান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের একজন তরুণ সদস্য। মো. হাবীব আজমকে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত, হেয়-প্রতিপন্ন ও ঘায়েল করার যে অপপ্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার প্রেক্ষাপট অনুধাবনের পূর্বশর্ত হলো তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা। ইতিহাস অজ্ঞাত রেখে ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করলে তা অবিচারেই পরিণত হয়।
সে জীবনের শুরু থেকে পারিবারিকভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ছিল। হাবীব আজমের সংক্ষিপ্ত জীবনী পর্যালোচনা করে জানা যায়, রাঙামাটি জেলা জিয়া শিশু-কিশোর সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মো. হাবীব আজম। তৎকালীন সময়ে সংগঠনের কমিটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কারণে তাঁর নামের স্থলে হাবিবুল্লাহ হাবীব মুদ্রিত হয়েছিল। ফলে বিভিন্ন সংবাদপত্র, দাওয়াতপত্র ও প্রচারসামগ্রীতে সেই নামই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বাস্তবে ব্যক্তি ও পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি ছিল না, ছিল কেবল অসতর্কতা। অথচ সেই পূর্বের ভুলকে কেন্দ্র করে আজ কিছু মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য। শুধু এই ভুল নয়, পরবর্তীতে তিনি বিএনপির সহযোগী অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পদে ছিলেন-সেসব আজ কেন জানি অস্বীকার করা হচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় কে কাকে কখন খাটো করে বা ক্ষমতা ব্যবহার করে ঘায়েল করে, তা বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট। রাঙামাটির বাসিন্দা হিসেবে এখানকার প্রকৃত চিত্র, রাজনীতি, জনজীবন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ন্যূনতম ওয়াকিবহাল। সেই দিক থেকে হাবীব সম্পর্কেও টুকিটাকি জানি। পাহাড়ের রাজনীতি খুব কঠিন-এটা অপ্রিয় সত্য।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর সক্রিয়তা ছিল সুস্পষ্ট ও উচ্চকণ্ঠ। বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়োগকৃত মাননীয় মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানকে অতীতে প্রধান অতিথি করে জিয়া শিশু-কিশোর সংগঠনের একাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন হাবীব আজম। সেই সময় রাঙামাটির রাজনৈতিক অঙ্গনে দীপেন দেওয়ানকে কোণঠাসা করার প্রতিযোগিতা চলছিল। অনুকূল পরিবেশ তো ছিলই না, বরং ছিল প্রবল প্রতিবন্ধকতা, নানামুখী চাপ এবং হুমকি। তবু তিনি নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসেননি। দীপেন দেওয়ানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর বিরূপতা, এমনকি একাধিকবার শারীরিক সংঘাতের পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে। সুসময়ের সহচর হওয়া সহজ, কিন্তু দুঃসময়ের সহযোদ্ধা হওয়া দুর্লভ। সেই দুর্লভতার পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন দৃপ্ত কণ্ঠে স্লোগান তুলে।
রাঙামাটির রাজপথ, বিশেষত বনরূপা এলাকা, একসময় তাঁর স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী উচ্চারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত মুখ। সহযোদ্ধাদের নিকট তিনি “স্লোগান মাস্টার” নামেই সমাদৃত ছিলেন। ২০১৩ সালে যখন বিএনপির টানা হরতাল চলছিল, প্রতিটি দিন রাজপথে উপস্থিত থেকে কর্মসূচি সফল করতে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বর্তমান জেলা ছাত্রদলের বিপ্লবী সভাপতি সাব্বিরের নেতৃত্বে বিভিন্ন মিছিলেও তিনি সম্পূর্ণ সময় উপস্থিত থেকে প্রখর রৌদ্রে স্লোগান দিয়ে কর্মীদের উদ্দীপ্ত করেছেন। এমন ধারাবাহিক উপস্থিতি ও আত্মনিবেদন সবার ভাগ্যে জোটে না।
সেই সময় হরতালবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে সম্মুখসারিতে ছিলেন হাবীব। আন্দোলনের উত্তাপে যখন অনেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন অগ্রভাগে। বর্তমান জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উভয়েই তাঁর ত্যাগ ও ভূমিকার বিষয়ে অবগত। রাজনৈতিক সংগঠনে পদ অলঙ্কার মাত্র, প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে ত্যাগ, সাহস ও নৈতিক দৃঢ়তায়।
বিগত সময়ে বিএনপি পরিবারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন হাবীব আজম। ২০১৪ সালে সদর থানা জাসাস কমিটিতে সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক পদেও ছিলেন। কিন্তু পদমর্যাদা আঁকড়ে থাকা তাঁর লক্ষ্য ছিল না। পাহাড়ের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার প্রয়োজনে তিনি সংগঠনের কাঠামোগত অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, তবুও আদর্শিকভাবে জিয়া পরিবার বা বিএনপি পরিবার থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের বিরোধিতায়। এমনকি ২৪-এর আন্দোলনে ১ আগস্ট থেকে রাজপথে থাকা আন্দোলনকারী ছাত্রদের প্রতিবন্ধকতা ও পুলিশের বাধায় যাতে পড়তে না হয়, সেজন্য সংবাদপত্রের আইডি কার্ড সরবরাহ করেন হাবীব আজম। স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদ পতনেও ভূমিকা রাখেন তিনি।
রাঙামাটিতে যেখানে অনেক পরিবার সুবিধাবাদী বিভাজনের রাজনীতিতে অভ্যস্ত, সেখানে হাবীবের পরিবার সুস্পষ্টভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর ছোট ভাই ওমর মোরশেদ রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি। তাঁর পিতা চান মিয়া ২০০২ সালে পৌর বিএনপির সদস্য ছিলেন। অর্থাৎ পারিবারিকভাবেই একটি আদর্শিক ধারাবাহিকতা বহমান রয়েছে। তারপরও গুটি কয়েক ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য প্রচার করে তাঁকে বিতর্কিত করার প্রয়াস নিচ্ছে, যা রাজনৈতিক ন্যূনতম নৈতিকতার পরিপন্থী।
সমাজে ষড়যন্ত্রকারীর অবস্থান কখনো উচ্চে থাকে না। যাঁরা হাবীবকে কাছ থেকে চেনেন, তাঁর অতীত সংগ্রাম ও আত্মনিবেদনের ইতিহাস জানেন, তাঁরা তাঁকে সম্মান করেন। জেলা পরিষদের সদস্য হওয়ার পর হয়তো সবার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে সীমাবদ্ধতাও যুক্ত থাকে। কারও আবদার অপূর্ণ থাকলেই তাকে টার্গেট বানানো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমার কেউ নন। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করেছেন—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। জেলা পরিষদে দায়িত্ব গ্রহণের পরও তাঁকে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা তাঁকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তাঁকে ঘিরে অপপ্রচার শুনে আক্ষেপ জন্মায়। কারও অতীত সংগ্রাম, ত্যাগ ও অবদানের ইতিহাস অগ্রাহ্য করে কেবল সাময়িক গুঞ্জনের ভিত্তিতে চরিত্রহননের প্রয়াস গ্রহণ করা অনুচিত। একসময় বিএনপির পক্ষে রাজপথে সংগ্রাম করা মানুষের সংখ্যা ছিল অল্প। আজ সংখ্যা বেড়েছে, পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস রচনায় যাঁরা প্রথম সারিতে ছিলেন, তাঁদের অবদান বিস্মৃত হওয়া নৈতিক দারিদ্র্যের পরিচায়ক।
দুঃসময়ের কর্মীদের উপেক্ষা করে সুসময়ের নতুন মুখদের নিয়ে মাতামাতি করা যেমন অমার্জিত, তেমনি ব্যক্তিগত রোষানলে কারও রাজনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রয়াসও অশোভন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বাস্থ্যকর বিকাশের জন্য প্রয়োজন তথ্যনিষ্ঠ মূল্যায়ন, গুজবনির্ভর অপপ্রচার নয়।
অতএব, হাবীব আজমকে নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বা মন্তব্য করার আগে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, ত্যাগ, আদর্শিক অবস্থান ও পারিবারিক ঐতিহ্য বিবেচনায় নেওয়া উচিত। ইতিহাস না জেনে বিভ্রান্তি ছড়ানো যেমন অন্যায়, তেমনি নীরব থেকে অন্যায়ের প্রশ্রয় দেওয়াও সমানভাবে দোষের। সত্যের পক্ষে উচ্চারণই হোক আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।