সাতক্ষীরা জেলার প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও অপরিসীম। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই জেলা পর্যটন শিল্পের এক বিশাল খনি। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে, স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বর্তমানে ‘ডিপ্লোমা ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট’ বিভাগ চালু আছে। সাতক্ষীরার তরুণরা যদি এই বিভাগ থেকে চার বছর মেয়াদি বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করে, তবে তারা কেবল নিজেদের ভাগ্য বদলাবে না বরং পুরো জেলার অর্থনৈতিক চেহারাই পাল্টে দিতে পারবে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে ইকো ট্যুরিজম, মানসম্মত রিসোর্ট পরিচালনা এবং বিদেশি পর্যটকদের গাইড করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবলের যে অভাব রয়েছে। সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প এবং লোকজ সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক পর্যটকদের কাছে পেশাদারত্বের সাথে উপস্থাপন করার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জন্য আয়ের নতুন উৎস তৈরি হবে। এর ফলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এলাকার পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়বে।
চার বছর মেয়াদি এই বিশেষায়িত ডিপ্লোমা শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দক্ষ করে গড়ে তোলে। এই দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করার পর একজন শিক্ষার্থী পর্যটন এবং আতিথেয়তা শিল্পের বিভিন্ন খুটিনাটি ও কারিগরি খাত সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে। এটি কেবল একটি সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং আধুনিক আতিথেয়তার মানদণ্ড বজায় রাখতে সক্ষম পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলে। এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে এক অনন্য হাতিয়ার। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলাগুলোতে যেখানে কৃষি বা মাছ চাষের ওপর চাপ বাড়ছে, সেখানে পর্যটন শিক্ষা যুবসমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে সাহায্য করবে।
বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হলে আমাদের দেশীয় সেবার মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। একজন পর্যটক যখন কোনো দেশে যান, তিনি সেখানকার মানুষের শিষ্টাচার ও পেশাদারিত্ব গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করেন। চার বছরের এই ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষা, কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে আচরণের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পর্যটন শিল্পে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে যা পর্যটকদের বারবার এ দেশে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি টেকসই পর্যটন বা ‘সাস্টেইনেবল ট্যুরিজম’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা শিক্ষার্থীদের পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটন বিকাশে উদ্বুদ্ধ করে, যা সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর বনাঞ্চল রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এই শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে আমরা একটি আধুনিক ও স্মার্ট পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যদি এই শিক্ষার আলো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানো যায়, তবে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের পর্যটনকে বিশ্বমঞ্চে ব্রান্ডিং করতে হলে পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই এবং সেই পেশাদারিত্ব আসে সঠিক ও মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা থেকে। ডিপ্লোমা ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট তাই কেবল একটি শিক্ষাক্রম নয় বরং এটি বাংলাদেশের এবং বিশেষ করে সাতক্ষীরার মতো সম্ভাবনাময় জনপদের অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন ও উদ্ভাবনী দিগন্ত।
লেখক: জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর ( টেক/ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট) , সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।