ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ১১, ২০২৬ - ২:৫৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ভোটে বিজয়ী হলেও বিএনপির চার প্রার্থীর ‘ভাগ্য নির্ধারণ’ হবে আদালতে

  • আপডেট: Wednesday, February 11, 2026 - 12:00 pm

 

নিজস্ব প্রতিবেদক।। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটে বিজয়ী হলেও বিএনপি মনোনীত চারজন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই চারজন হলেন-চট্টগ্রাম-৪ আসনের আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর, শেরপুর-২ আসনের ফাহিম চৌধুরী ও কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া।

এরমধ্যে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সংশ্লিষ্ট আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তাদের বিষয়ে আদালত বলেছেন, তারা নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত থাকবে, ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ হবে না।

অন্যদিকে, ফাহিম চৌধুরীর দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে জামায়াত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া ও মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্রে দলীয় প্রত্যয়নপত্র না থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী হাছান আহম্মেদের করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদালত বলেছেন, তারা ভোটে বিজয়ী হলে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ ও শপথগ্রহণে কোনো বাধা নেই। মামলায় জয়ী হলে তারা সংসদ সদস্য পদে থাকবেন। কিন্তু আপিলকারীরা মামলায় জয়ী হলে তাদের সংসদ সদস্য পদ থাকবে না।

 

আইনজীবীরা বলছেন, এই চার প্রার্থী যদি ভোটে হেরে যান তবে মামলার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, আদালত বলেছেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। এমন কোনো আদেশ দেবেন না, যার ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপিরা সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পায়। অনেকের মনোনয়ন বাতিলও করেছিলেন।

 

‘কিন্তু আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের মামলা যেহেতু শেষের দিকে তাই আদালত মনে করছেন নির্বাচন থেকে তাদের দূরে রাখাটা গণতন্ত্রের পক্ষে সঠিক হবে না। আমি বলবো এক্ষেত্রেও আদালত ন্যায়বিচার করেছেন। যদি প্রমাণ হয় তারা ঋণখেলাপি নন, তবে বিজয়ী হলে সঙ্গে সঙ্গে ভোটের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করে দেবে নির্বাচন কমিশন। আর ভোটে হেরে গেলে মামলার কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকবে না’—বলেন এ আইনজীবী।

সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কে রহমান বলেন, আপিল বিভাগে এটি নতুন ও ব্যতিক্রমী আদেশ। এর আগে আমরা এমন আদেশ দেখিনি। যদিও আমরা মনে করি, ঋণখেলাপিদের নমিনেশনের বৈধতা না দিলে সব দল ও প্রার্থীসহ সবাই সতর্ক হতো। ওয়েস্ট বেঙ্গল (ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) এটি করেছে। এখানে পরে সুপ্রিম কোর্টে এসেছে। নির্বাচন কমিশন থেকেই এটি করা উচিত ছিল।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইফুল আলম ইজ্জল বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে স্ট্যান্ডটা নেওয়া দরকার ছিল রাজনৈতিক দলগুলার। কিন্তু জেনেশুনেও ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা কাউকে কাউকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা রয়েছে।

তিনি বলেন, এখন যদি তারা ভোটে জিতেও আদালতে আপিলকারীর কাছে হেরে যান তবে সেটা ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তখন সংশ্লিষ্ট আসনে নেক্সট যিনি থাকবেন তিনি ইলেক্টেড হবেন, অর্থাৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।

চট্টগ্রাম-৪ আসনের আসলাম চৌধুরী
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ও যমুনা ব্যাংক পৃথক লিভ টু আপিল করে।

আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন জানান, আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন। আদালত বলেছেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল গেজেটে আকারে প্রকাশ হবে না।

এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা গত ৩ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও পৃথক আপিল করে।

শুনানি নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন দুটি আবেদনই খারিজ করে। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। পরে ইসির সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আনোয়ার সিদ্দিকী ও ব্যাংক পৃথক রিট করেন। গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দেন। এক্ষেত্রেও আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।

পরে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আনোয়ার সিদ্দিকী ও সংশ্লিষ্ট যমুনা ব্যাংক আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যা গত ২৯ জানুয়ারি চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন চেম্বার আদালত আবেদন আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।

এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশের প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন। লিভ টু আপিল ও ব্যাংকের করা আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ফলাফল স্থগিতের আদেশ দেন আপিল বিভাগ।

চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর
চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থীর করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।

আদেশের পর সারোয়ার আলমগীরের আইনজীবী আহসানুল করিম জানিয়েছেন, নির্বাচনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন সারোয়ার আলমগীর। লিভ মঞ্জুর হওয়ায় আপিলের ওপর শুনানি হবে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলটি করেছিলেন চট্টগ্রাম-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। আপিল বিভাগের আদেশের পর তার আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন। আদালত বলেছেন, সারোয়ার আলমগীর নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল প্রকাশিত হবে না।

এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হয়েছিল। জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিন অভিযোগটি করেছিলেন।

শুনানি নিয়ে ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে। তার প্রার্থিতা বাতিল হয়। এর বৈধতা নিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পেতে সারোয়ার আলমগীর গত ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিটটি করেন।

গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল দিয়ে সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিলের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। একই সঙ্গে তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ও ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন নুরুল আমিন।

শেরপুর-২ আসনের ফাহিম চৌধুরী
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আর কোনো বাধা নেই। গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এক আদেশে তার প্রার্থিতা বহাল রাখেন।

এর আগে, ফাহিম চৌধুরীর নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে একই আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর করা একটি ‘লিভ টু আপিল’ শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।

আদেশের পর ফাহিম চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আদালতের এ আদেশের ফলে ফাহিম চৌধুরীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আর কোনো বাধা নেই।

তবে আপিলকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু বলেন, বিএনপির প্রার্থী ফাহিম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিলেও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ইস্যুতে করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আসনের নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত থাকবে।

কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া
কুমিল্লা-১০ আসনের ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া নির্বাচন করতে পারবেন। তার প্রার্থিতা নিয়ে করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে গত ১ ফেব্রুয়ারি আদেশ দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।

আদালতে মোবাশ্বের আলমের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া জানান, মোবাশ্বের আলম নির্বাচন করতে পারবেন। তবে ভোটের ফলাফল কী হবে, সেটি আপিল নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করবে।