ঢাকা | জানুয়ারী ৩, ২০২৬ - ৭:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

গ্যাস সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট, মিলছে না বেশি দামেও

  • আপডেট: Saturday, January 3, 2026 - 10:05 am

জাগো জনতা অনলাইন।। হঠাৎ লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। বেশি দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন আগের ১২৫৩ টাকার এলপিজি গতকাল শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। এর পরও অনেক এলাকায় মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকেই সরবরাহ নেই, তাই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লাইনের গ্যাসেও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ক্যাব বলছে, বিইআরসির নীরবতায় বাজারে বড় ধরনের কারসাজি চলছে। শুধু রাজধানী নয়, দেশজুড়েই এ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

রাজধানীর শনির আখড়ার গোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান গতকাল শুক্রবার সকালে একই এলাকার শামসুলের দোকান থেকে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে দেখেন দোকান বন্ধ; দোকানদারকে কল করলে জানান, তার কাছে কোনো গ্যাসের সিলিন্ডার নেই। এরপর তিনি পুরো এলাকা ঘুরেও গ্যাস কিনতে পারেননি। বেশি দাম দিয়েও গ্যাস না পেয়ে তিনি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে বাসায় ফেরেন। মেহেদী হাসান আমার দেশকে বলেন, এমন পরিস্থিতির শিকার ইতঃপূর্বে আর কখনো হননি।

ডেমরার সারুলিয়া এলাকার বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান জানান, ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার গ্যাস গতকাল কিনেছেন ১৮০০ টাকায়। দুপুরে তা ২২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখেছেন তিনি। বিকালের দিকে অনেকে এর চেয়েও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার গ্যাস পাননি। তিনি বলেন, দাম বাড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে দোকানদাররা সরবরাহের সংকটের কথা জানান।

শুধু এলপিজি নয়, লাইনের গ্যাসেরও সংকট দেখা দিয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।

শনির আখড়ার পলাশপুর এলাকার বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘চার দিন ধরে লাইনে গ্যাস নেই, রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে খাচ্ছি। বুঝতেই পারছেন আমরা কতটা বিপদে আছি।’

মতিঝিলের মানিকনগর এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান মম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় লাইনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দিনের বেশির ভাগ সময়ই খুব অল্প গ্যাস আসে, নিভু নিভু চুলা জ্বলার কারণে রান্না করা যাচ্ছে না। এই সংকট দীর্ঘদিনের হলেও কয়েক দিন থেকে তীব্র আকার ধারণ করেছে ‘

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, বিইআরসি এলপিজির দাম ঠিক করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা তদারক না করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিইআরসির ভূমিকায় শিথিলতার কারণেই ভোক্তারা এমন বিপাকে রয়েছেন।

ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সরবরাহকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির এলপিজির সিলিন্ডার ২৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এটা খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। সরবরাহের সংকট থাকলেও বেশি দামে তো ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বেশি দামে বিক্রি আইনত অপরাধ। বিইআরসির শিথিলতাকে দায়ী করব। তারা দাম নির্ধারণ করলেও বাজার মনিটরিংয়ে তাদের ভূমিকা নেই। তারা এই কারসাজির বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না। এই সংস্থার প্রতি ভোক্তার অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনও বাড়তি দামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

এ প্রসঙ্গে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ বন্ধ রাখায় হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে চাহিদার তুলনায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে খুবই কম। এছাড়া প্রতি সিলিন্ডারে কোম্পানি বাড়তি দাম নিচ্ছে। তবে সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর আগে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি নেওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে আগামী ৪ জানুয়ারি বিইআরসির নতুন দাম ঘোষণার কথা রয়েছে। বিইআরসি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, শীতের সময়ে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯ জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপর চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। ডিসেম্বরে আমদানি করা হয়েছে ৯০ হাজার টন। আমদানি খরচ বাড়ায় কিছু কোম্পানি বাড়তি দাম রাখতে পারে।

এ প্রসঙ্গে লোয়াবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সরবরাহ সংকটেই মূলত বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে বাজারে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ সব সময়ই ছিল। এবারের মতো এতটা বাড়তি দামে বিক্রি আগে দেখা যায়নি। বিষয়টি ইতিমধ্যে বিইআরসির নজরে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গত বৃহস্পতিবার এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ডিসেম্বরে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এ হিসাবে প্রতি ১২ কেজির দাম দাঁড়ায় এক হাজার ২৫৩ টাকা। নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে বলে কমিশনে অভিযোগ এসেছে। কমিশনের আদেশ অনুসারে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ভোক্তার কাছে খুচরা বিক্রেতার কোনো পর্যায়েই বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে না। তাই সব পর্যায়ে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, বাড়তি দামে বিক্রির বিষয়টি নজরে আসায় লোয়াবকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আমদানিকারকদের আমদানি খরচ বাড়লে তারা তা কমিশনে জমা দেবে। কাগজ-কলমে বাড়তি খরচের বিষয়টি নিশ্চিত হলে কমিশন নতুন মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নেবে। তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ নেই।